চলমান কথা

গত ১১ মে, ২০২০ আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অনলাইন পরীক্ষার শুভ উদ্বোধন করেন প্রকৌশলী এ এম এম সাজ্জাদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপিএসসিএল।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু; স্বপ্ন হলো সত্যি। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সাথে স্বপ্ন যাবে বাড়ি।

Wednesday, July 29, 2020

  পল্লী উন্নয়ন

ভূমিকা:

‘লাগলে মাথায় বৃষ্টি বাতাস
উল্টে কি যায় সৃষ্টি আকাশ
বাঁচতে হলে লাঙ্গল ধর রে
আবার এসে গাঁয়।’
                                            -শেখ ফজলুল করিম।

হরিতে-হিরণে, সবুজে-শ্যামলে, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ- যার মূলভিত্তি ‘ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলো’। প্রায় বিরানব্বই হাজার গ্রাম (বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী) নিয়ে গঠিত এই দেশের শতকরা ৭৭ জন১ লোক পল্লাীগ্রামে বাস করে। পল্লীর সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা রূপ নিয়ে কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল-

’আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন
মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন’

কিন্তু পল্লীর সে-সৌন্দর্য এখন আর দেখা যায় না, আমাদের অবহেলার কারণে পল্লীগ্রামগুলো আজ শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। মানুষ কেবলই- ‘ইটের পর ইট মাঝে মানুষ-কীট, নেইকো ভালোবাসা নেইকো মায়া’- এমনি কৃত্রিম সুখের অন্বেষণে শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অথচ কৃষিনির্ভর এই দেশের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়, যদি না পল্লীর উন্নয়ন হয়। পল্লীর উন্নতি মানে দেশের উন্নতি।

পল্লী উন্নয়ন কী?: পল্লী উন্নয়ন বলতে পল্লীর উৎপাদন বৃদ্ধি, সম্পদের সুষম বণ্টন ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক পরিকল্পিত পরিবর্তনকে বুঝায়। আজকের বাংলাদেশে পল্লী উন্নয়নের নির্দিষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামীণ ভিত্তহীনদের, বিশেষ করে পশ্চাৎপদ মহিলা ও শিশুদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম করা। এবং সে নিয়ন্ত্রণের ফলশ্রুতি হিসেবে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার যথাযথ বণ্টন।

সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচি:
পল্লী উন্নয়নের একটি নবতর পদ্ধতি বা পল্লী উন্নয়নে সাম্প্রতিক ভাবনা : দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী গ্রামে বাস করে। তাই দেশের অর্থনীতি এখনও গ্রামীণ মানুষের সার্বিক কৃষি ও অন্যান্য কর্মের ওপর নির্ভরশীল। দেশের উন্নয়ন করতে হলে আমাদের গ্রামীণ জনগণের জীবন মান উন্নয়ন করতে হবে। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগণ দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করছে। গ্রামীণ জনগণ প্রায়ই বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেক সময় অকাল মৃত্যুর কবলে পড়ে অল্প বয়সে পৃথিবীর সম্ভাবনাময় জীবনের ইতি টানছেন। অপরদিকে শিক্ষার নিম্নহার আমাদেরকে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে দারুণভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব যখন কম্পিউটার জগতে প্রবেশ করে অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা এখনও গণ স্বাক্ষরতা কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। তাছাড়া প্রতি বছর প্রাকৃতিক দূযোগ ব্যাপক হারে গ্রামীণ জনগণের জানমালের ক্ষতি করছে। ফলশ্রুতিতে আমরা বিশ্ববাসীর জীবন মানের তুলনায় বিরাট অসম দূরত্বে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছি। এ লক্ষে পরনির্ভরশীরতা কাটিয়ে পারিবারিক পর্যায়ে পরিবারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত পূর্বক গ্রামের সব পরিবারের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নসহ গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন সমতালে এগিয়ে নেয়ার উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদ আহরণের মাধ্যমে এবং গ্রামীণ জনগণের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ছোট ছোট তৃণমূল পরিকল্পনার ভিক্তিতে পারিবারিক ও গ্রামীণ উন্নয়নের বিকাশ সাধনই পল্লী উন্নয়নের সাম্প্রতিক ভাবনা।২

প্রাচীন-পল্লী:
চাষী ক্ষেতে চালাইতে হাল,
তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল-
বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার।
তারি’পরে ভার দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।’
                                                                        -রবীন্দ্রনাথ।

-প্রাচীন পল্লীর এই ছিল রূপ। আদিকাল থেকেই পল্লীগ্রাম ছিল দেশের প্রাণকেন্দ্র। পল্লীবাসী মানুষের ছিল গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর-ভরা মাছ, গলায় গলায় গানের সুর, কুটিরশিল্পের প্রচলন। ঢাকার মসলিন কাপড় ও জামদানি শাড়ি তৎকালীন মোগল বাদশাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, কুমিল্লার হুক্কা ও খদ্দর-কাপড়, ময়নামতির ছিট কাপড়, পল্লীর নকশীকাঁথাও তৎকালীন ঐতিহ্য বহন করেছিল।

বর্তমান-পল্লী:
’বড় দুঃখ, বড় ব্যথা সম্মুখেতে কষ্টের সংসার,
আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ।
মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি,
চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি।
আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন
মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন।
                                                               -বন্দে আলী মিয়া

গ্রামের সেই সহজ-সরল চিত্রপঠ এখন আর নেই। দিন বদলের পালায় বদলে যাচ্ছে অনেক কিছুই। সর্বগ্রাসি বিশ্বায়নের এই যুগে বদলে যাচ্ছে মানুষের রুচি, অভ্যাস, পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, পেশাসহ অনেক কিছুই। গত এক বা দুই যুগের ব্যবধানে শুধু যে রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্যান্য শহরের চাকচিক্য ও জৌলুশ বেড়েছে তাই নয় গ্রাম পর্যায়ে আরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর আমাদের ঘরের চালে লাউ-কুমড়োর সবুজ লতানো গাছপাতা শোভা পায় না। কোনো গ্রামে ছায়াঘেরা মাটির দেয়াল তোলা ছনের ঘর চোখে পড়ে না। প্রায় সব গ্রামেরই চোখে পড়বে পাকা দালান-কোঠা। গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। ফ্রিজ, টিভি এখন ঘরে ঘরে। খাওয়ার পানির জন্য গ্রামের বাড়িতে আগে ছিল পাতকুয়ো এবং ইদারা, আজ তা নিশ্চিহ্ন। সে স্থান দখল করে নিয়েছে নলকূপ। গত শতক নাকি চিহ্নিত হয়েছে প্রযুক্তির উন্নয়ন, প্রসার ও ব্যবহারের জন্য। তার ঢেউ বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যে লাগে নি তা নয়। বেশ ভালোভাবেই লেগেছে। তার মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে আশ্চর্যজনকভাবে। গ্রামেগঞ্জে যার তার হাতেরই এই ফোন। এটা ছাড়া কারোই দিন চলছে না। চাষাবাদ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দেশ-বিদেশে থাকা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা সকল ক্ষেত্রেই চলছে মোবাইলের ব্যবহার। গ্রামীণ জীবনের অচলায়তন ভাঙতে এই মোবাইলের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বিচার বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। দক্ষিণ বাংলায় যেখানে বিদ্যুৎ যায় নি সেখানে দেখা যাচ্ছে সৌর বিদ্যুতের প্যানেল, রহিম আফরোজ, গ্রামীণ শক্তি এসব প্যানেল বিক্রি করছে। আরেকটা বড় মানসিক পরিবর্তনের কথা না বললেই নয়। সেটা হল স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা। গ্রামের দরিদ্ররা আজ কোনো না কোনোভাবে একটা কাজ খুঁজে নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছ। গ্রামেগঞ্জে এখন নানারকম কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। হাঁস-মুরগী পালন, ছাগল-গরু পালন, মাছ চাষ, নানা উন্নত জাতের কৃষি ফলনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ জনগণ এখন নিজ প্রচেষ্টায়ই স্বাভলম্বী হতে শুরু করছে। স্ব-নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। শহরের মানুষ বাসার জন্য গ্রামের দরিদ্র ছেলেমেয়েদের খুঁজত ’কাজের ছেলে’ বা ’কাজের মেয়ে’ হিসেবে নিয়োগের জন্য। আজকাল তেমন কাউকে পাওয়া মুশকিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান অনেকটাই কমে আসছে। এখন নব্য ধনীক শ্রেণী ও যুবক শ্রেণী গ্রামের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে। পূর্বে গ্রামের বয়স্ক মাতব্বর এই ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করত। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষালাভের আগ্রহ বাড়ছে এবং তারা শিক্ষিত হচ্ছে। এভাবে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গ্রামের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ও পরিবর্তন ধারা অব্যাহত আছে।

পল্লী উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বা জাতীয় উন্নতিতে পল্লীর গুরুত্ব: আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল উৎস পল্লী। পল্লী উন্নয়ন ব্যতীত দেশের সর্বমুখী বা সর্বজনীন কল্যাণ সম্ভব নয়। পল্লীর অবস্থান ও উন্নয়নের উপর বাংলাদেশের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। তাই পল্লীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে হবে। আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্যে যেসব উপকরণ প্রয়োজন, পল্লীতে তার কোনো অভাব নেই, অভাব শুধু যুগোপযোগী শিক্ষা, আদর্শ ও কর্মপ্রেরণার। পল্লী সব সময়েই উন্নয়নযোগ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে পল্লীর সামগ্রীক উন্নয়নসাধন সম্ভব। তাই কবিগুরুর সাথে তাল মিলিয়ে বলতে পারি-
”ফিরে চল ফিরে চল মাটির টানে।”

পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পণা: পল্লীর ভাগ্য উন্নয়নের মাঝেই সার্বিক উন্নয়ন নির্ভরশীল একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এ উন্নয়ন- কাজে অগ্রসর হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পল্লীবাসীকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। সকল সময় সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে চলবে না। আত্মশক্তির উপর ভরসা করেই আমাদেরকে পল্লী-উন্নয়ন কাজে অগ্রসর হতে হবে। উন্নয়নের প্রতিটি ব্যবস্থা যাতে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে, তার জন্যে সুষ্ঠু পরিকল্পণা গ্রহণ করতে হবে।

পল্লী উন্নয়নের উপায় ও গৃহীত উদ্যোগ: বাংলাদেশে পল্লী উন্নয়নের চাবিকাঠি হল : (ক) দারিদ্র্য দূরীকরণ, গ্রামীণ দরিদ্রদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, (খ) আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন, (গ) ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, (ঘ) পরিকল্পনা প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন, সুযোগ সুবিধার অংশীদারিত্ব, পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির মূল্যায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ; (ঙ) অপ্রতুল সম্পদের ব্যবহার ও বণ্টন নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রামীণ জনগণকে অধিকতর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান। তাই সঠিক কর্মসূচি নিয়ে গ্রামে জনগণের উন্নতিকল্পে এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়া যায়:

পল্লী উন্নয়নের উপায়:

(১) শিক্ষার ব্যবস্থা:
‘এই বড় মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা,
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা।’
গ্রামের মানুষের জন্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পল্লীর অনগ্রসরতার মূল কারণ অশিক্ষা ও কুশিক্ষা।

(২) স্বাস্থ্য উন্নয়ন: পল্লীর ৭৫% শিশু অপুষ্টির শিকার। বছরে ত্রিশ হাজারেরও বেশি শিশু অন্ধত্বের কবলে পড়ে, লাখ লাখ শিশু মারা যায় ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার আক্রমণে। অধিকাংশ গ্রামে রয়েছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সমস্যা। সাম্প্রতিক কালে গ্রামে গ্রামে আর্সেনিক দূষণ গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্যরক্ষার মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত স্বাস্থ্য শক্তিশালী- জাতি গঠনে সহায়ক- এ সত্যকে সামনে রেখে পল্লীর জনস্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

(৩) কৃষি উন্নয়ন: বাংলাদেশের পল্লীজীবন কৃষিভিত্তিক। বর্তমান যুগের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় কৃষিব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে আমাদের দেশে কৃষকদের অধিক খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়ন করতে হবে।

(৪) কুটিরশিল্পের উন্নয়ন: কুটিরশিল্পের মাধ্যমে গ্রামের বেকারদের কর্মসংস্থান করতে হবে। কুটিরশিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাহায্যের হাত সরকারকে প্রসারিত করতে হবে। কারণ, গ্রামবাসীর অগ্রগতিই দেশের অগ্রগতি।

(৫) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: যাতায়ত ও মালামাল পরিবহনের জন্যে রাস্তাগুলোর সংস্কার সাধন ও পর্যাপ্ত নতুন রাস্তা নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

(৬) মৎস্য চাষের ব্যবস্থা: গ্রামে অনেক হাজামজা পুকুর নালা ডোবা পতিত অবস্থায় আছে। এগুলো সংস্কার করে মাছ চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৭) পল্লী বিদ্যুতায়ন: পল্লীর জনগণের উন্নতির জন্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন একান্ত অপরিহার্য। আমাদের দেশের অধিকাংশ গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছায় নি। তাই যত শীঘ্র সম্ভব প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৮) সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা: গ্রামের জনগণকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে তাদেরকে সঞ্চয়ী করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়ী ব্যাংক যেমন: গ্রামীণ ব্যাংক, সমবায় ব্যাংক প্রভৃতি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও-

(৯) ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা

(১০) কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা

(১১) সমবায় প্রবর্তন করা

(১২) প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ও পরবর্তী পুনর্বাসন এবং

(১৩) সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে।
গৃহীত উদ্যোগ: বর্তমান পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচিতে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি প্রচেষ্টা পল্লী উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। পল্লীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর আর্থ- সামাজিক উন্নয়ন ঘটানোর জন্যে কৃষি, গবাদি পশু পালন, সমবায়, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে প্রশিক্ষণ, গণসচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সর্বোপরি উপর্যুক্ত আলোচনায় পল্লী উন্নয়নের জন্যে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে সরকার ইতোমধ্যে সবকটি পদক্ষেপই নিয়েছেন, তন্মধ্যে-

১. গ্রামে শিক্ষাবিস্তারের জন্যে স্কুল-কলেজের ব্যবস্থা করেছেন।
২. বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, গণশিক্ষা, সর্বজনীন শিক্ষা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বায়স্কশিক্ষা, অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।
৩. গ্রামীণ অর্থনীতিকে সবল করার জন্যে সরকারি ও বেসরকারি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
৪. কুটিরশিল্পের উৎকর্ষ বিধানের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দান ও মূলধন সরবরাহ করা হচ্ছে।
৫. কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছে।
৬. জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যে নানাধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
৭. জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত মোকাবিলায় এবং বেকার-সমস্যা সমাধানে নানাধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
৮. যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাপল্পে নানাধরনের প্রক্রিয়া অব্যাহত হয়েছে।
৯. ঋণের ব্যবস্থা করেছেন।
১০. গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টি আর) কর্মসূচির আওতায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮০ মে. টন চাল ব্যয়ে ৯৪ হাজার ১৭০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।

পল্লী উন্নয়নের জন্যে সরকারের এভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে পল্লীর জীবনে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। বিংশ শতাব্দীর গ্রামকে আর অবহেলিত বলা চলে না, একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে শহর আর গ্রামের পার্থক্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে- যা আমাদের সবার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও বহুবিধ সমস্যা ও বাধা রয়ে গেছে।

পল্লী উন্নয়নের সমস্যা: পল্লী উন্নয়ন প্রয়াস সম্পর্কিত অতীত অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ থেকে বড় ধরনের বেশ কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করা যায়, যেগুলি সকল প্রয়াসের সফল সম্পাদনকে ব্যাহত করে আসছে। এসব সমস্যা হচ্ছে: ১. পল্লী উন্নয়ন সংস্থাসমূহের অস্থায়িত্ব, ২. অযোগ্য ও দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্ব, ৩. কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক স্থানীয় সরকারগুলোকে অসহযোগিতা, ৪. একটা সুবিন্যস্ত পল্লী উন্নয়ন নীতিমালার অভাব, ৫. পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প থেকে উদ্ভূত সযোগ-সুবিধার অসম বণ্টন, ৬. প্রাকৃতিক ও লব্ধ সম্পদের সীমাবদ্ধতা, ৭. পল্লী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও পরিকল্পনায় উচ্চশ্রেণীর আধিপত্য এবং অসহায়ক এক গ্রামীণ সমাজ।

বাংলাদেশের পল্লীর আর্থসামাজিক বুনিয়াদের প্রকৃতিই পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দেখা দেয়। সেসব বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পুঁজি গঠনের নিম্নস্তর, কৃষি নির্ভর অর্থনীতি, নিপুণ ও শিক্ষিত জনশক্তির অভাব, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, বিদেশি সহায়তার উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম্য রাজনৈতিক দলাদলি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনুন্নত বাজার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ।

একবিংশ শতাব্দীর পল্লী উন্নয়ন চিন্তা: বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিপর্যয়ের সম্মূখিন। এ দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহের মধ্যে দরিদ্রতম এবং বেশির ভাগ জনসংখ্যা মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে অপরিকল্পিত এবং মাত্রাধিক্য ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ ব্যাপক ক্ষতির স্বীকার হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ এবং শষ্য উৎপাদনের জন্য মাটির উর্বরতা কিংবা উৎপাদনশীলতা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে কৃষির ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। আর স্বয়ংসম্পন্ন কৃষি ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করছে গ্রামীণ উন্নয়ন। এ জন্য একবিংশ শতাব্দীর পল্লী উন্নয়ন চিন্তা ভাবনায় কৃষিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এ লক্ষে মাটির উপাদন, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষণের প্রতি জোড় দেয়া হচ্ছে।

আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য: গ্রামে সহস্র অভাব, এই ভেবে গ্রাম ত্যাগ করলে চলবে না। গ্রামের মানুষকে ফিরে যেতে হবে গ্রামে এবং গড়তে হবে কলুষমুক্ত গ্রাম। সমস্যা এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হয় না। গ্রামের উন্নয়নকে নিজের মনে করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রবল প্রচেষ্টায় গ্রামের হৃতশ্রী পুনরুদ্ধার সম্ভব।

উপসংহার: দেশের পঙ্গু অর্থনীতিকে সজীব ও জীবন্ত করে তুলতে হলে গ্রামকে সজীব করে তুলতে হবে। ’গ্রামই দেশের প্রাণ’ এটা ভুলে গেলে চলবে না। ড. লুৎফর রহমান বলেছেন- ‘জাতিকে বড় করতে হলে পল্লীর মানুষকে প্রথমে জাগাতে হবে।’ গ্রামের উন্নতি ও দেশের উন্নতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আশা করা যায়, অচিরে আমাদের সরকার ও সচেতন দেশবাসীর সক্রিয় সহযোগিতায় গ্রামগুলোকে আমরা ‘সোনার গ্রাম’ হিসেবে দেখার সুযোগ পাব। তখন আমরা অতি আনন্দে নিমন্ত্রণ করবে-
”তুমি যাবে ভাই
যাবে মোর সাথে
আমাদের ছোট গাঁয়?” 
 শিষ্টাচার

শিষ্টাচার কি?: আচরণে ভদ্রতা ও সুরুচিবোধের যৌক্তিক মিলনের নাম শিষ্টাচার। শিষ্টাচার মনের সৌন্দর্যের বাহ্য উপস্থাপনা। তার মার্জিততম প্রকাশ ঘটে সৌন্দর্যবোধের মাধ্যমে। যে মানুষ যত বেশি শিষ্ট তার প্রিয়তাও তত বেশি। আর এই শিষ্টতা তার চরিত্রকেও করে আকর্ষণীয়। মানুষের মাঝে লালিত সুন্দরের প্রকাশ তার চরিত্র। শিষ্টতা সেই সুন্দরের প্রতিমূর্ত রূপ।

অন্তর্গত মহত্ত্ব মানুষকে উদার করে। আর সেই উদারতা ব্যক্তিকে রূঢ় করে না, তাকে শিষ্ট আর ভদ্র হতে শেখায়। মানুষের মাঝে এই মহত্ত্বের পরিশীলিত প্রকাশই শিষ্টতা। সাধারণভাবে চালচলন, কথাবার্তায় যে ভদ্রতা, শালীনতা আর সৌজন্যের পরিচয় পাওয়া যায় তা-ই শিষ্টতা। শিষ্টাচার ব্যক্তিজীবনের যেমন তেমনি সমাজজীবনেরও গৌরবসূচক আভরণ।

আচরণে যদি মানুষ শিষ্ট না হয়, ব্যবহারে উগ্রতা যদি পরিহার না করে তবে কখনো শিষ্টাচার হওয়া সম্ভব নয়। স্বভাবে কৃত্রিমতা পরিহার করতে না পালে কখনো পবিত্র মনের অধিকারী হওয়া যায় না। মানবিক সত্তা তার স্ফুরণে চরিত্রে সাধুতাকে অবলম্বন করে, তার প্রকাশ ঘটে শিষ্ট স্বভাবে। ঐদ্ধত্য আর উচ্ছৃঙ্খলতা এখানে পরাজিত হয়। অহংকার অন্যকে ছোট ভাবতে শেখায়। শিষ্টতা বিপরীতভাবে মানুষকে সম্মান করতে শেখায়। কদর্যতা আর অশ্লীলতা শিষ্টাচারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কাজেই ব্যক্তিকে হতে হয় আচরণে মার্জিত, বক্তব্যে সৎ, সরল আর স্পষ্ট। বিনয় মানুষকে ছোট করে না, বরং পরায় সম্মানের মুকুট। এই বিনয় শিষ্টতার অঙ্গভূষণ।

শিষ্টাচারের গুরুত্ব: আচরণে যে জাতি যত বেশি সভ্য সে জাতি তত বেশি সুশৃঙ্খল ও উন্নত। কেবল পশুপাখির মতো বেড়ে ওঠাই মানুষের লক্ষ্য নয়। আত্মোন্নয়নের পাশাপাশি সমাজ ও জাতীয় জীবনে কোনো-না-কোনো ভাবে অবদান রাখা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। আর তা করতে হলে শিষ্ট আচরণের অনুশীলন ছাড়া বিকল্প নেই। শিষ্টাচারের প্রথম প্রকাশ ঘটে ব্যক্তিস্বভাবে। যা ক্রমাগত ব্যক্তি থেকে আলোর বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা সমাজে, রাষ্ট্রে। এর আলোতে উজ্জ্বল ব্যক্তির আত্মিক মুক্তির সাথে যোগ হয় বৈষয়িক অগ্রগতি। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে প্রতিনিয়তই আমাদের সমাজের অপরাপর দশ জনের সাথে যোগাযোগ আর ভাবের আদান-প্রদান করতে হয়। এরই মাঝে শিষ্টজন সহজে সকলের মন জয় করতে পারে। পারস্পরিক সম্প্রীতির জন্যে এর খুবই প্রয়োজন। কেননা সম্প্রীতি না থাকলে হিংসা আর হানাহানি সমাজকে ঠেলে দেয় বিশৃঙ্খলার দিকে।

শিষ্টাচারী ব্যক্তি দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু তার সৌজন্যে আর বিনয়ের মাধ্যমে সে সকলের প্রিয়তা অর্জন করে। শিষ্টজন সহজেই অর্জন করেন অন্যের আস্থা। অন্যের সহানুভূতি লাভ করার জন্যে শিষ্টজনই উত্তম। অপর দিকে শিষ্টাচারীকে সকলে সম্মানের চোখে দেখে। সামাজিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্যে শিষ্টাচারের বিকল্প নেই। এতে করে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে সকলের আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে আসে সুষম উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি।
শিষ্টাচার ও ছাত্রসমাজ: জ্ঞানার্জনে নিষ্টা, অভিনিবেশ আর শৃঙ্খলাবোধের পাশাপাশি শিষ্টাচার অনুশীলন খুবই জরুরি। নৈতিক চরিত্রে উৎকর্ষের জন্যে ছাত্রজীবনেই ব্যবহারের ভব্যতা আর শিষ্টতার সম্মিলন ঘটানোর কোনো বিলল্প নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে জ্ঞানের সাথে শিষ্টাচারের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। ছাত্রজীবনে শিষ্টাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ঘটে পোশাক-পরিচ্ছদে। রুচিশীল আর সরল জীবন-যাপনের পাশাপাশি পোশাকের ক্ষেত্রেও সুরুচির পরিচয় থাকা দরকার।

শিষ্টাচার ও সমাজ: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক- প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিষ্টাচারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তা না হলে বিদ্বেষ, হিংসা, হানাহানি আর অশান্তি জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠায় সমাজ-ব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব প্রদর্শন করা দরকার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে যৌক্তিক সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনকে এগিয়ে নিলে শিষ্টাচারী হওয়া যাবে না। সমাজে নিজের অবস্থান সম্পর্কে থাকতে হবে সতর্ক। সামাজিক অবস্থান শিষ্টাচারের মাত্রা নির্ধারণ করে। এই ভাবে ক্রোধ আর প্রতিহিংসার মতো চারিত্রিক দোষগুলো অতিক্রমের চেষ্টা থাকতেই হবে। এব বিপরীতমখী দিনগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্যে দরকার চারিত্রিক দৃঢ়তা।

শিষ্টচার ও রাষ্ট্র: জাতীয় জীবনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিষ্টতার প্রকাশ পায় রাষ্ট্র পরিচালনায়, নেতৃত্ব প্রদানকারীদের মধ্যে। এর প্রভাব পড়ে গোটা দেশজুড়ে। আবার আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণে কুটনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিষ্টতার বিকল্প নেই। চরম লাভ-লোকসানের ব্যাপার ব্যবসা-বাণিজ্যেও শিষ্টচারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

শিষ্টাচার না থাকার কুফল: শিষ্টাচারহীন সমাজ ও অন্তঃসারশূন্য, বিবেকহীন। সমাজে সৌন্দর্য আর সুকুমার প্রবৃত্তিগুলোর দেখা মেলে না। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে বিরোধ হয়, দ্বন্দ্বযুদ্ধ হয়। সর্বোপরি মানব সভ্যতা চরম হুমকির মুখোমুখি দাঁড়ায়। শিষ্টাচারহীন মানুষ সবসময় উদ্ধত থাকে। আলাপ-আলোচনায় তার মধ্যে প্রকাশ পায় অমার্জিত ভাব। তার আচরণে প্রাধান্য পায় দুর্ব্যবহার ও দুর্মুখতা।

শিষ্টাচার অর্জনের উপায়: শিষ্টাচার নিজ থেকে মানব হৃদয়ে জন্ম নেয় না। একে বরণ করে নিতে হয়। এর চর্চা শুরু হয় শিশুকাল থেকেই। তাই শিশু কোন পরিবেশে, কার সহচর্যে কীভাবে বেড়ে উঠছে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে পয়োজন শিক্ষার। কেননা আমৃত্যু চলতে থাকে শিষ্টাচারের অনুশীলন। শিশু পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথী কিংবা প্রতিবেশী যাদের সাহচর্য়ে থাকে তাদের কাছ থেকেই আচরণ শেখে। তাই সৎসঙ্গ শিষ্টাচারী হতে সাহায্য করে। স্কুল-কলেজেও শিক্ষার্থীরা শিষ্টাচারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। ভালো বইও একজন সৎ অভিবাবকের মতোই শিষ্টাচার শেখাতে পারে।

উপসংহার: শিষ্টাচারের ভিত্তিভূমিকার ওপর গড়ে ওঠে সৎ চরিত্রের সুরম্য অট্টালিকা। সৎ চরিত্রবান ব্যক্তি সমাজ ও জাতীয় জীবনে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা শিষ্টাচারের অন্তরায়। তা প্রতিনিয়ত মানবিক মূল্যবোধগুলো ধ্বংস করে সমাজকে করে তুলতে পারে নিঃস্ব রিক্ত সর্বস্বান্ত। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে আমরা হতে পারি সমস্যা-জর্জরিত। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে সুস্থতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে তাই আমাদের শিষ্টাচারের চর্চা করা উচিত।
   সংবাদপত্র

ভূমিকা: সংবাদপত্র আধুনিক জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। গণতান্ত্রিক যে-কোনো দেশে তা সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের দর্পণ। সমাজজীবনের দৈনন্দিন পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ততায় এবং নিরন্তর তার বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনায় সংবাদপত্র এখনো শক্তিশালী গণমাধ্যম। জনমতের প্রতিফলনে ও জনমত গঠনে সংবাদপত্র পালন করে শক্তিশালী ভূমিকা। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বহু দল ও মতের ধারক-বাহক হিসেবে সংবাদপত্র সরকার ও জনগণের মধ্যে রচনা করে সেতুবন্ধন।

সংবাদপত্রে মানদণ্ড: একটি সংবাদ পত্রের চারটি গুণ থাকা আবশ্যক। যথা:

(১) সহজপ্রাপ্যতা: একটি সংবাদ পত্র সহজে জনসাধারণের কাছেই থাকবে। যেমন দোকান, লাইব্রেরি, হকার্স দ্বারা ঘরে ঘরে পাঠেয়ে ইত্যাদি। বর্তমানে এতই সহজপ্রাপ্য যে ইন্টারনেটে দেশের বা বিশ্বের জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলো সহজেই দেখা যায় ও পড়া যায়।

(২) পর্যাবৃত্তি: যেসকল পত্রিকা দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, পাক্ষিক বা অন্য যেকোনো ধারায় প্রকাশ করা হয় সেগুলো তাদের নির্দিষ্ট সময় পর পর পুনঃ পুনঃ প্রকাশ করবে। এই ধারার পরিবর্তন হয় না। যেমন যে পত্রিকা সাপ্তাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় সেটি প্রতি সাত দিন পর পর অবশ্যই প্রকাশিত হবে এবং এই ধারা ভঙ্গ হবে না।

(৩) সাম্প্রতিকতম: সংবাদপত্র যে পর্যাবৃত্তিতেই প্রকাশিত হোকনা কেন তা অবশ্যই হতে হবে সর্বশেষ সত্য সংবাদে পূর্ণ।

(৪) সার্বজনীনত্ব: সংবাদপত্র অবশ্যই হতে হবে সব মানুষের জন্য। কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ বা বিশেষ গোষ্টিকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ হবে না বা অন্য গোষ্টিকে তাচ্ছিল্য করবে না। সংবাদপত্র হবে সকলের।

একটি ভালো মানের পত্রিকার এই চারটি দিক অবশ্যই থাকে।
সংবাদপত্রের ইতিহাস: সংবাদপত্রের ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রাচীন কালে রোমে সরকারের সংবাদ জনগণের নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য সংবাদ পাথরে খোদাই করে তা নির্দিষ্ট দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো। এরপর চীনে একটি রাজনৈতিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো ব’লে জানা যায়। ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্ব কালে সরকারের অভ্যন্তরিন কর্মচারীদের মধ্যে সংবাদ আদান প্রদানের জন্য একটি হাতে লিখা সংবাদের কাগজ আদান প্রদান হতো।

১৭৮০ সালে ইংরেজদের মধ্যে সংবাদ প্রেরণের জন্য কলকাতায় দুই পাতার ‘ইন্ডিয়ান গেজেট’ নামে একটি ইংরেজী সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৮ সালে ’সোমপ্রকাশ’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করনে। ১৮৬১ সালে প্রথম বাংলা ছাপা অক্ষরে ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০০৭ সাল থেকে কাজগের সংবাদপত্রের পাশাপাশি হুবহু সংবাদপত্র ইন্টারনেটে থেকেও পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সংবাদপত্রের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: দৈনন্দিন জীবনের নানা অপরিহার্য তথ্য প্রতিদিন আমাদের হাতে তুলে দেয় সংবাদপত্র। পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যার মতো খবরাখবর সংবাদপত্র আমাদের জানিয়ে দেয়। এভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়াতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার খবর পড়ে নিহত-আহতের সন্ধানে ছুটে যেতে পারে তাদের আত্মীয়-পরিজন। সাম্রজ্যবাদী কিংবা আগ্রাসী তৎপরতা যখন সভ্যতাকে গ্রাস করে তখন সংবাদপত্র তার বিরুদ্ধে মানবতার জাগরণ ঘটায়। পারমাণবিক যুদ্ধ কিংবা স্নায়ুযুদ্ধের ভয়াবহতায় পৃথিবীর ধ্বংস-আশঙ্কা দেখে দিলে শান্তির সপক্ষে নেয় সচেতন দায়বদ্ধ ভূমিকা। দেশে সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র জনগণের টুটি চেপে ধরলে সংবাদপত্র তার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের পটভূমি রচনা করে। গণআন্দোলনের পক্ষে নেয় কার্যকর অবস্থান। যেখানেই মানবতার লাঞ্ছনা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিবেকের কণ্ঠরোধ, সেখানেই সংবাদপত্রের কণ্ঠস্বর নেয় প্রতিবাদী ভূমিকা।

আধুনিক সংবাদপত্রের বিষয়-বিস্তার: আধুনিক সংবাদপত্র কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়। দেশ-বিদেশের রানীতি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও এতে থাকে বিচিত্র তথ্য প্রতিবেদন। শিল্প-সাহিত্যের আলোচনা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা তথ্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বিনোদন জগতের বিচিত্র কর্মধারা এখন সংবাদপত্রের আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি, ইতিহাস, ধর্ম, ভূগোল, দর্শন- যে-কোনো বিষয়ের খবরাখবর, প্রবন্ধ এখন সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। শিশু-কিশোর ও ছাত্রছাত্রীদের জন্যে থাকে আলাদা বিভাগ, আলাদা পাতা। মেয়েদের জন্যে তো আলাদা পাতা থাকেই। এখন আমাদের দেশে পত্রিকার পাতায় আলাদাভাবে যোগ হয়েছে কোনো বিশেষ এলাকার জন্যে সাপ্তাহিক আলাদা পাতা। দীর্ঘকাল ধরে জনমত ও জনজীবনের সমস্যা ভিত্তিক চিঠিপত্রের কলাম ছিল পত্রিকার বিশেষ অঙ্গ। এখন কোনো কোনো পত্রিকা আবার পঠকদের নিয়ে আলাদা মঞ্চ বা ফোরাম গঠনেরও উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা বিশেষ বিশেষ ইস্যুতে পাঠকদের মতামত জরিপ করে তার প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এবং ঐসব ইস্যুতে সরকার ও জাতির করণীয় সম্পর্কে আলোকপাতের চেষ্টা করছে। আসলে সংবাদপত্র এখন জনজীবনের প্রায় সব দিককেই তার আওতায় নিয়ে আসতে চাইছে। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভির প্রভাব ব্যাপক হয়ে পড়ায় তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যে সংবাদপত্র নিত্যনতুন বিষয়কে ধারণ করছে। ফলে এখন সংবাদপত্র হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের নির্দেশিকা। ভাগ্য গণনা, পাত্র-পাত্রী নির্বাচন, চাকরির সন্ধান, অবসর নিবোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, হরতাল-ধর্মঘট, সভা-সমাবেশ, আলোচনা-সেমিনার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নির্দেশিকা, পরীক্ষার তারিখ ও ফলাফল, বার্ষিকী কিংবা দিবস পালন, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে, পুরস্কার ও সম্মাননা- কী থাকছে না সংবাদপত্রে? দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সংবাদপত্র এখন আমাদের চলমান নির্দেশিকা।

সংবাদপত্র ও জনমত গঠন: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রকৃত ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে। ফলে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভূমিকা জাতীয় অগ্রগতির পক্ষে কতটা সহায়ক এবং কতটা জনস্বার্থের পরিপূরক তা নিয়ে জনগণের মধ্যে অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ক্ষমতাসীনরা সবসময় তাদের পদক্ষেপকে জোর গলায় ইতিবাচক বলে প্রচার করে এবং বিরোধীরা তাকে একেবারেই প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু সংবাদপত্র উভয় পক্ষের মতামত, যুক্তি ও তথ্যনির্ভর আলোচনা প্রকাশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজেদের অভিমত গঠন করতে পারে। সংবাদপত্রের পাতায় জ্ঞানীগুণী ও বিশেষজ্ঞদের লেখা প্রবন্ধ ও অভিমত, কলাম লেখকদের তর্কবিতর্ক, যুক্তিপ্রদান ও যুক্তিখণ্ডন, পত্রিকার নিজস্ব সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় মতামত জনমত গঠনে সাহায্য করে। আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি ইত্যাদি ইস্যুতে জনমত গঠনে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য কখনো কখনো কোনো কোনো সংবাদপত্র বিশেষ গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থে জনমতকে তাদের পক্ষে টানার জন্যে সংকীর্ণ উদ্দেশ্যপূর্ণ নানারকম প্রচারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু পাঠক সমাজ সচেতন হলে শেষ পর্যন্ত এসব সংবাদপত্রের অপপ্রচারের চেষ্টা ও হীন উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরিপূরক ভূমিকা: সংবাদপত্র বর্তমানে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরিপূরক ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমভিত্তিক এবং পরীক্ষা-নির্ভর সার্টিফিকেট প্রদানের শিক্ষা শিক্ষার্থীর জ্ঞানের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা নোট ও গাইড-বই নির্ভর মুখস্থ বিদ্যায় পরিণত হয়েছে। সংবাদপত্র এখন যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রকেই তার আওতায় এনেছে তার ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠে বহুমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। এত তাদের জ্ঞানের ক্ষেত্র যেমন সম্প্রসারিত ও বিকশিত হয় তেমনি বিষয়জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষাজ্ঞানও বাড়ে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটে। তাদের শিক্ষা হয় সর্বতোমুখী।

সংবাদপত্রের অপকারিতা: সংবাদপত্রের অনেক উপকারিতা থাকলেও কিছু কিছু অপকারিতাও আছে। কখনো কখনো মিথ্যা, উদ্ভট খবর প্রচার করে পাঠককে বিভ্রান্ত করে থাকে। এতে মানুষ এবং দেশের ক্ষতি হয়। সংবাদপত্রের মালিকানা ব্যক্তিগত বলে মালিকের খেয়ালখুশিমত তা পরিচালিত হয়। কোনো কোনো পত্রিকা রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে বানোয়াট খবর প্রচার করে, এতে দেশ ও জনগণের উপকারের চেয়ে অপকার হয় বেশি।

উপসংহার: বর্তমানে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানব উন্নয়ন এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে সংবাদপত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যেও সংবাদপত্র ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। উন্নততর জীবন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আগ্রহ সৃষ্টিতেও সংবাদপত্রের দায়িত্ব কম নয়। বর্তমানে স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তির ফলে গণমাধ্যমে উন্নত দেশের একচেটিয়া আধিপত্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশের সংবাদপত্রকে হতে হবে ঐতিহ্য-সচেতন, জাতীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। আমাদের দেশে ব্যাপক নিরক্ষরতা, সমাজজীবনে পশ্চাৎপদতা ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে সমাজজীবনে আদুনিক ধ্যান-ধারণা ও বিজ্ঞানমুখী চেতনার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা হতে হবে কল্যাণমুখী। লুটেরা পুঁজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজজীবনে যে সন্ত্রাস, ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিভেদ ও জবরদস্তিমুলক মানসিকতার বিস্তার ঘটেছে, তার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে এবং দেশে গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন সুশীল সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র সততা ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দেবে- এটাই সবার কাম্য। জনস্বার্থে ও মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই সংবাদপত্রকে সত্যিকার অর্থে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
 কৃষিকাজে বিজ্ঞান

ভূমিকা: একটু পেছনে ফিরে তাকালে আজ চমকে উঠতে হয়- কত পরিবর্তন এসেছে আমাদের জীবনযাত্রায়। এ পরিবর্তন একশ বছর আগে মানুষের কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু আজ এটাই বাস্তব সত্য। আর এই সত্যের পেছনে অনন্য ও অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে বিজ্ঞান। আজকের বিশ্বে প্রতিটি মানুষকে বিজ্ঞান দান করেছে তার সর্বব্যাপী মহাশক্তি। বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অভাবনীয় বেগ, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে করেছে দ্রুততর। ঘুচিয়ে দিয়েছে দূর-দূরান্তের ব্যবধান। বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ প্রকৃতিকে করেছে তার আজ্ঞাবাহী। আর এই বিজ্ঞানই আজ তার সুদূরপ্রসারী কল্যাণী হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কৃষিক্ষেত্রে।

মানবজীবনে কৃষির গুরুত্ব: কৃষি মানুষের অস্তিত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। মানবজীবন ও মানবসমাজে এর গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে এটি মানুষের আদিমতম জীবিকার উপায়। দেশে দেশে কৃষিই সমাজের মেরুদণ্ড, কৃষিই সমাজের ভিত্তি। স্বভাবতই কৃষির ক্রমোন্নতিতেই সমাজের ও দেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতি।

কৃষির প্রাচীন প্রেক্ষাপট: আদিম সমাজে মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্যের জন্যে নির্ভর করত বন্য পশু-পাখি, জীবজন্তু, ফলমূল ও মাছের উপর। একসময় মানুষ বীজ বপন ও ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজেই যোগাতে শেখে। এভাবে মানব সভ্যতায় কৃষি ও কৃষকের আবির্ভাব ঘটে। প্রাথমিক অবস্থায় গরু, ঘোড়া, মোষ প্রভৃতি জন্তুর সাহায্যে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করা হত। কৃষকেরা ফসলের জন্যে সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল ছিল আবহাওয়ার উপর। কখনও প্রচণ্ড খরায়, কখনও অতিবৃষ্টিতে ফসলহানি ঘটত । ফলে, কৃষকের ফসল পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাাঁড়িয়েছিল। আবার একই জমিতে বার বার একই ফসল উৎপাদনের ফলে জমির উর্বরতা কমে যেত। ফলে উৎপাদন হত কম। এছাড়া উন্নত বীজের অভাবে উৎপাদিত ফসলও ভাল হতো না। সুতরাং এক কথায় বলা যায়, কৃষির প্রাচীন প্রেক্ষাপট ছিল কৃষকদের হতাশার প্রতিচ্ছবি।

কৃষির আধনিকায়নে বিজ্ঞান: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে কৃষির আধনিকায়নের সূচনা ঘটে। এর ফলে কৃষকেরা কৃষিক্ষেত্রে উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি ও কৃষি পদ্ধতির সাথে পরিচিত হয়। জন্তু আর কাঠের লাঙ্গলের পরিবর্তে কৃষকদের হাতে আসে কলের লাঙল, ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। উন্নত দেশগুলোতে জমি কর্ষণের পুরনো পদ্ধতিগুলো লোপ পেয়েছে। সেচ ব্যবস্থাতেও বিজ্ঞান অনেক পরিবর্তন এনেছে। কৃষকদের এখন ফসলের জন্য প্রকৃতির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় না। গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যে জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সেচের জন্যে ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদ্যুৎ শক্তি চালিত পাম্প। অতিবৃষ্টিও আজ কৃষককে ভীত করছে না। বিজ্ঞানের বদৌলতে জমির অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন আজ অত্যন্ত সহজ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে কৃষিক্ষেত্রে নতুন অকল্পনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছেন। উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে বিজ্ঞান কৃষিক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখেছে তাও অভাবনীয়। বিশেষ করে কৃত্রিম উপায়ে উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদনে সাফল্য বিস্ময়কর। এসব বীজ সাধারণ বীজের তুলনায় ফসল উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে সময়ও কম নেয়। সুতরাং বীজ নিয়েও কৃষকদের অতীতের অনিশ্চয়তা দূর করেছে বিজ্ঞান। আর শক্তিশালী রাসায়নিক সার আবিষ্কৃত হওয়ায় ফসল উৎপাদনে এসেছে অভূতপূর্ব সাফল্য। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বের বৃষ্টিহীন শুষ্ক মরু অঞ্চলে চাষাবাদ শুরু করার প্রচেষ্টা চলছে বিজ্ঞানের সহায়তায়। সেদিন দূরে নয় যেদিন এক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা সাফল্য অর্জন করবেন।

উন্নত বিশ্বের কৃষি: উন্নত দেশগুলোর কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিজ্ঞাননির্ভর। জমিতে বীজ বপন থেকে শুরু করে ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত সমস্ত কাজেই রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছোঁয়া। বিভিন্ন ধরণের বৈজ্ঞানিক কৃষিযন্ত্র যেমন, মোয়ার (শস্য ছেদনকারী যন্ত্র), রপার (ফসল কাটার যন্ত্র), বাইন্ডার (ফসল বাঁধার যন্ত্র), থ্রেশিং মেসিন (মাড়াই যন্ত্র), ম্যানিউর স্প্রেডার (সার বিস্তারণ যন্ত্র) ইত্যাদি উন্নত দেশগুলোর কৃষিক্ষেত্রে এনেছে বৈপ্লবিক সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের খামারে একদিনে ১০০ একর পর্যন্ত জমি চাষ হচ্ছে কেবল এক একটি ট্রাক্টরের মাধ্যমে। সেগুলো আবার একসাথে তিন-চারটি ফসল কাটার যন্ত্রকে একত্রে কাজে লাগাতে সক্ষম। তারা কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে অগ্রগামী। যেমন বলা যায় জাপানের কথা। জাপানে জমির উর্বরাশক্তি বাংলাদেশের তুলনায় এক চতুর্থাংশ। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে তারা এদেশের তুলনায় ৬ গুণ বেশি ফসল উৎপাদন করছে।

কৃষি ও বাংলাদেশ: বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এদেশের মাটি ও জলবায়ু অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় কৃষির অনুকূলে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো যখন প্রতিকূল অবস্থা ঘুচিয়ে ফসল উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক নেশায় মেতেছে সেখানে বাংলাদেশের কৃষকেরা তার কাঠের লাঙল আর একজোড়া জীর্ণ বলদ নিয়ে চেয়ে আছে আকাশের পানে বৃষ্টির প্রতীক্ষায়। একথা সত্যি যে বাংলাদেশেও কৃষি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় সফলতাও এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের শতকরা আশিভাগ কৃষক এখনও সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে চলেছে। শিক্ষা, সচেতনতা, মূলধন, পুঁজি ইত্যাদির অভাবে তারা কৃষিকাজে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তারা শ্রম দিচ্ছে কিন্তু উপযুক্ত ফসল পাচ্ছে না। কেননা তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করতে পারছে না।

উপসংহার: বিজ্ঞান আজ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। উন্নত দেশগুলোতে বিজ্ঞানের সাহায্যে পাহাড় কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করে বিভিন্নভাবে কৃষি জমি তৈরি করা হচ্ছে। ফসল আবাদের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা বিজ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ তারা কৃষিক্ষেত্রে লাভ করছে বিরাট সাফল্য। কৃষিক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সুজলা-সফলা আমাদের এই দেশে বিজ্ঞানের জাদুর ছোঁয়া আমরা যত বেশি কাজে লাগাতে পারব ততই কৃষি আমাদের দেবে সোনালি ফসলসহ নান ফসলের সম্ভার। কৃষকদের সচেতনতা, সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাদের সাহায্য প্রদান এবং বাংলাদেশে কৃষি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাই পারে আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে- বাংলাদেশকে একটি সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যমলা দেশ হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে।
 চরিত্র

ভূমিকা: চরিত্র এমন একটি শক্তি, ব্যক্তিত্বের এমন একটি দিক যা ন্যায় নীতি ও নৈতিক জীবনাচরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। একজন মানুষের স্বভাবে ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকতে পারে। মন্দের পাল্লা ভারি হলে সে দুশ্চরিত্র বলেই পরিচিত হয়। অন্যদিকে সৎ চরিত্রের অধিকারী বলতে আমরা বুঝি তিনি ন্যায়বান ও সুবিবেচক। অন্তর শক্তির দৃঢ়তা, অধ্যাবসায় ইত্যাদিও সুচরিত্রের অঙ্গ। চরিত্র অনুযায়ী গঠিত হয় ব্যক্তিজীবন যার প্রভাব গড়ে পরিবেশ ও সমাজ জীবনের ওপর।

চরিত্র কী: চরিত্র শব্দটি ইংরেজি ‘Character’ শব্দের প্রতিশব্দ হলেও মূলত তা এসেছে গ্রিক থেকে। আদিতে এর অর্থ ‘চিহ্ন’ হলেও প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে শব্দটি ব্যক্তির আচরণ ও আদর্শের উৎকর্ষবাচক গুণ বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

চরিত্র গঠনের দুটো দিক রয়েছে। সচ্চরিত্র ও দুশ্চরিত্র। উৎকর্ষবাচক নানা গুণের সমন্বয়ে গঠিত চরিত্র সচ্চরিত্র। আর মানুষের মধ্যে লুকানো অপকর্ষ বা পশুত্ব যদি হয় চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য তবে সেই চরিত্রই দুশ্চরিত্র। চরিত্র মানবজীবনের এক মহামুল্যবান অবিনাশী সম্পদ। যিনি সৎ চরিত্রের অধিকারী তিনি সমাজের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার ও প্রজ্বলিত দীপশিখা। এ কারণেই চরিত্রকে জীবনের মুকুট বলা হয়। মুকুট যেমন সম্রাটের শোভা বর্ধন করে, তেমনি চরিত্র মানবজীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সততা, সহৃদয়তা, সংবেদনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, ঔদার্য, কর্তব্যপরায়ণতা, গুরুজনে ভক্তি, মনবিকতা ও আত্মসংযম ইত্যাদি সচ্চরিত্রের লক্ষণ। যিনি চরিত্রবান তিনি কখনও সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হন না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। তিনি সযত্নে ক্রোধ, অহঙ্কার, রূঢ়তা ইত্যাদিকে পরিহার করেন। তিনি হন সত্যবাদী, সংযমী ও ন্যায়পরায়ণ। যাবতীয় মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে বলে চরিত্রবান মানুষ জাতির সম্পদ।

চরিত্র ঘঠনের গুরুত্ব: মানুষের জীবনে চরিত্রে মূল্য ও গুরুত্ব কতখানি তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কেবল চরিত্রের শক্তিতে ও প্রভাবে মানুষ হতে পারে বিশ্ববরেণ্য ও চিরস্মরণীয়। বিদ্যার মূল্য মানবজীবনে অপরিসীম। কিন্তু বিদ্যার চেয়ে চরিত্রকেই অনেক সময়ে দেওয়া হয় অধিকতর গুরুত্ব। প্রবাদ আছে-

‘দুর্জন বিদ্যান হলেও পরিত্যাজ্য।’

কারণ, বিদ্যান লোক দুর্জন হলে তা সমাজের কল্যাণ না হয়ে অকল্যাণই হয় বেশি। এ প্রসঙ্গে একটি সুভাষিত স্মরণীয় উক্তি:

‘অমরত্বের সুধা পান না করেও মানুষ অমর হতে পারে কেবল চরিত্রের গুণে।”

তাই চরিত্রের বিকাশ সাধনই মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পৃথিবীতে নিজেকে খাঁটি ও উন্নত করে গড়ে তোলাই মানুষের কাম্য। চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের জীবন পদ্ধতিই কেবল নির্ধারিত হয় না, চরিত্রই এক অর্থে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

চরিত্র গঠন-মূলক শিক্ষার লক্ষ্য: চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে, যুক্তির শক্তিতে সমাজস্বীকৃত আচরণ অনুসরণে ব্যক্তির ইচ্ছা ও সামর্থ্যকে বিকশিত করা। ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি বিকাশের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত দিকগুলো শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

১. মানবিক গুণাবলির সমাহার হিসেবে ধৈর্য, সাহস, আনুগত্য, সততা, সৌজন্য, নির্ভরযোগ্যতা, কৃতজ্ঞবোধ, সহজ অমায়িকতা, পরহিতব্রত ইত্যাদি গুণাবলি;
২. শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরমত সহিষ্ণুতা, শিষ্টাচার ইত্যাদি সামগ্রিক আচার-আচরণ-অভ্যাস;
৩. দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবোধ, আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব, মানবপ্রেম ইত্যাদি সংগঠিত ভাবাবেগ;
৪. হিংসা, বিদ্বেষ, কুটিলতা ইত্যাদি মানসিতা পরিহার এবং বদ অভ্যাস বা প্রবৃত্তি দমন;
৫. ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, পরহিতব্রত ইত্যাদি মানবিক গুণাবলিকে জীবনের চালিকা শক্তি হিসেবে গ্রহণ।

শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠনের পদ্ধতি : দেশ ভেদে কাল ভেদে চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষায় ধারণা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পার্থক্য দেখা যায়। তা সত্ত্বেও বলা যায়, সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় চরিত্র গঠনের উপর বিশেষ গরুত্ব আরোপ করা হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে গুরুত্ব পায় : ন্যায়নীতি শিক্ষা, নৈতিক মান গঠন; কাজ, সততা, সৌন্দর্য, সৌজন্য, কৃতজ্ঞাবোধ ইত্যাদি গুণাবলির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি; পশুপাখির প্রতি মমত্ব ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি। সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষ পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি ও সুঅভ্যাস গড়ে তোলায় সহায়তা দান।

চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার পরোক্ষ পদ্ধতি হচ্ছে ইতিহাস, জীবন ও সাহিত্য থেকে পাঠের মাধ্যমে দৈনন্দিন আচরণ ও মূল্যবোধ সৃষ্টি। এভাবে মহৎ চরিত্র সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে আদর্শ ধারণা সৃষ্টি করা হয়।

চরিত্র গঠনে বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীর ভূমিকা ছাড়াও বয় স্কাউট, গার্ল গাইড, রেডক্রস ইত্যাদি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ। স্বেচ্ছা সংগঠনের মাধ্যমে মানুষ যৌথ কাজের গুরুত্ব ও আনন্দ অনুভব করতে পারে।

শিশু বয়সে চরিত্র গঠন: শিশুর চরিত্র যেন নির্মল ও স্বচ্ছ হয় সেজন্যে উপযুক্ত শিক্ষাদানে অভিভাবকদের পাশাপাশি তৈরি করতে হয় অনুকূল পরিবেশ। শিশুকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করা হলে তাতে সৃজনী প্রতিভা বিকশিত হয়। শিশুর জীবনে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটাতে হলে চাই সৎ সঙ্গ। পিতামাতা, সঙ্গীসাথী, আত্মীয়-পরিজন সৎ চরিত্রের অধিকারী না হলে এদের সাহচর্যে শিশুর মধ্যে সচ্চরিত্রের গুণগুলো সুদৃঢ় ভিত্তি পেতে পারে না।

পারিবারিক পরিবেশ ছাড়াও শিশুর নৈতিক বিকাশে বিদ্যালয় জীবন ও শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রভাব গরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের কাজ শিশুকে সুশিক্ষা দেওয়া। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটানোর গুরুদায়িত্ব তাঁদেরই। আজকাল শিশুর ভালো-মন্দ চরিত্র গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মতো গণমাধ্যম। স্যাটেলাইটের বিভিন্ন চ্যানেলে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় তার মধ্যে এমন অনুষ্ঠানও থাকে যা শিশুর জন্যে অনুপযোগী। শিশুস্বভাবতই টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই অভিভাবককে অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে যাতে তাদের শিশুদের চরিত্রের ওপর অপকৃষ্ট অনুষ্ঠানের কুপ্রভাব না পড়ে। এ কারণে খুন-জখম, মারামরি ও স্থুল বিকৃত রুচির বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান শিশুর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরণের অনুষ্ঠান দেখা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে।

তবে সর্বোপরি যে জিনিসটির ওপর অভিভাবককে বিশেষ সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তা হলো সৎ সঙ্গ। কুসঙ্গের পাল্লায় পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা অকালে ঝরে পড়ে, হারিয়ে যায় অন্ধকারে। এ সম্পর্কে প্রবাদ আছে- ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ তাই শিশুর সঙ্গী ও বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের সতর্ক বিবেচনা দরকার।

চরিত্র গঠনের সাধনা: চরিত্র গঠনের জন্যে ব্যক্তির নিজস্ব সাধনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লোভ লালসা ও অসৎ প্রবৃত্তির নানা কুপ্রলোভন মানুষকে পাপের পথে টানে। এসব পাপ পথ সতর্ক ও দৃঢ়চিত্তে পরিহার করে লোভকে জয় করার শক্তি অর্জন করে চরিত্রবানের আদর্শকে মশাল হিসেবে জ্বালিয়ে উন্নত জীবনের সাধনায় নিযুক্ত হলেই সুচরিত্র গঠনে এগিয়ে যাওয়া যায়। কেবল তাই নয়, চরিত্র রক্ষার জন্যেও মানুষকে আমৃত্যু নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে-

When money is lost nothing is lost
When health is lost something is lost
When character is lost everything is lost.

অর্থাৎ টাকা হারালে টাকা অর্জন করা যায়, স্বাস্থ্য হারালে তাও পুনরুদ্ধার করা যায়, কিন্তু চরিত্র হারালে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই মনুষ্যত্বের অধিকারী হবার জন্যে গড়ে তুলতে হবে সুন্দর, নির্মল ও পরিচ্ছন্ন চরিত্র।

মহৎ চরিত্রের দৃষ্টান্ত: পৃথিবীতে যারা চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁরা ছিলেন চরিত্র শক্তিতে বলীয়ান। কোনো প্রলোভনই তাদেরকে ন্যায় ও সত্যের পথে বিচ্যুত করতে পারে নি। এমনই চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন অন্যায়, অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে। যুগে যুগে সকলেই ছিলেন মানবব্রতী, ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মওলানা ভাসানীর মতো মানবব্রতী, সমাজব্রতী, দেশব্রতী মহাপ্রাণ সকলেই ছলেন উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। এমনি আরো অনেক মহৎ চরিত্রের মৃত্যুতে বিশ্বের মানুষ অশ্রুজল ফেলেছে। তাঁদের জীবনের মহিমা স্মরন করেই কবি লিখেছেন-

’এমন জীবন হবে করিতে গঠন
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’

চরিত্রবান ব্যক্তি ধনসম্পদে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও বংশ মর্যাদায় কাঙাল হলেও গৌরবে মহান। এ জন্যেই সুভাষিত উক্তিতে বলা হয়েছে:

‘রাজার প্রতাপ অর্থ-সম্পদে কিন্তু চরিত্রবানের প্রতাপ হৃদয়ে।’
উপসংহার: পরিভোগপ্রবণ বিশ্বে আজ চারপাশে বাড়ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। চরিত্রের শক্তি হারিয়ে ফেলতে বসেছে মানুষ। ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে অনৈতিক জীবনের অন্ধকারের অতলে। এ অবস্থায় জাতীয় জীবনে চাই চরিত্রশক্তির নবজাগরণ। যে প্রজন্ম চরিত্র হারিয়েছে তার কাছে কিছু আশা করার নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে বেড়ে উঠতে হবে চরিত্রের মহান শক্তি অর্জন করে। তা হলেই আমাদের ভবিষ্যৎ হবে সুন্দর।

 সত্যবাদিতা

ভূমিকা: যে-সব গুণ মানব-চরিত্রকে মহিমান্বিত করে তোলে ‘সত্যবাদিতা’ তার মধ্যে একটি মূল্যবান গুণ। সত্যের চেয়ে বড় গুণ আর দ্বিতীয়টি নেই। এই মহাবিশ্ব চির সত্যের ওপর দ-ায়মান। সত্য ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজেকে আবিষ্কার করে, মনুষ্যত্বকে অর্জন করে। তাই মানুষের সাধনা সত্যের সাধনা। সত্যবাদিতার গুণ অর্জন করাই মানুষের নিরন্তর সাধনা হওয়া উচিত। কোন কিছু গোপন না করে অকপটভাবে প্রকাশ করার বৈশিষ্ট্যের নামই সত্যবাদিতা।

বৈশিষ্ট্য: সত্য বলতে কোনো কিছুর যথাযথ প্রকাশ বোঝায়। আর সত্যবাদিতা অর্থ আরও ব্যাপক। শুধু ‘মিথ্যা না বলা’ বোঝাতে সত্যবাদিতা বোঝায় না। সত্যকে অবলম্বন করে যে বৈশিষ্ট্য বিকাশিত হয় তার নাম সত্যবাদিতা। সত্যের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা নেই। সত্য জীবনের স্বরূপ বিকশিত করে। সত্যবাদী লোকের কথা ও কাজে কোনো পার্থক্য থাকে না। সত্যবাদিতা মানুষকে খাঁটি সোনার মতো নিখাদ করে তোলে। সত্যের মধ্যে মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যের মধ্য দিয়েই মানুষ অর্জন করে সততা। সততা মানব চরিত্রের অপার একটি মহৎ গুণ। কোনো প্রকার পাপের কাজ থেকে দূরে থেকে ন্যায় ও সত্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে চরিত্রের বিকাশ ঘটাতে পারলে তাতে সততার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায়। তাই যুগে যুগে সত্যের সাধনা চলছে। প্রসঙ্গত কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-
‘এত সব যার প্রাণ উৎসব সেই আজ শুধু নাই,
সত্য-প্রাণ সে রহিল অমর, মায়া যাহা হল ছাই!
ভুল যাহা ছিল ভেঙে গেল মহাশূন্যে মিলালো ফাঁকা,
সৃজন-দিনের সত্য যে, সে-ই রয়ে গেল চির আঁকা।’

শ্রেষ্ঠ গুণ: সত্যবাদিতা মানবজীবনের একটি শ্রেষ্ঠ গুণ। যে-সব গুণ জীবনকে সার্থক ও বিশিষ্ট করে তোলে তার মধ্যে সত্যবাদিতার স্থান সবার ওপরে। সত্যের অনুসারণে জীবন সুন্দর হয়। সত্যকে অবলম্বন করলে জীবনে সাফল্য অনিবার্য। সত্যবাদী লোক সমাজে সম্মান ও মর্যাদার আসন পান। সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে। সকল পাপের উৎস হল মিথ্যা। কেননা মিথ্যা থেকেই শুরু হয় প্রতারণা, জালিয়াতি, শঠতাসহ নানাবিধ কুকর্ম। তাই মিথ্যা বলা মহাপাপ। আর সত্যবাদিতা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ।

সত্যবাদিতার সুফল ও প্রয়োজনীয়তা: সত্যবাদীকে সবাই বিশ্বাস করে। সমাজে তাঁকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং ভালোবাসে। অপরদিকে মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না। সমাজে তাকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। সমাজে সত্যের জয় এবং মিথ্যার পরাজয় নিশ্চিত। সত্যবাদিতা থেকে বিচ্যুত হলে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে ফলে সমাজ জীবনে অবৈধ কার্যকলাপ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং মানুষের মহৎ গুণাবলির তিরোধান ঘটে। মানুষ তখন নানা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সমাজে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। তাই আদর্শ জীবনযাপনের জন্য সততা ও সত্যবাদিতা অপরিহার্য।

বাস্তব অবস্থা: সততা ও সত্যবাদিতা বাস্তব জীবনের একটি মহত্তর দিক হলেও বাস্তব জীবনে বিশেষত দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যথার্থ মর্যাদা লাভ করতে পারছে না। সততা পরিহার করে মানুষ সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ফলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিকেই তারা প্রাধান্য দিয়ে নানা রকমের অত্যাচার, অনাচার ও দুর্নীতি করে চলেছে। অসততার প্রতি মানুষে তেমন প্রতিবাদ বা বিরূপতা দেখা যাচ্ছে না। সততা বিসর্জন দিয়ে মানুষ এখন নিজের স্বার্থ সাধনে তৎপর। অন্যায় বা অবৈধ পথ অনুসরণ করায় এখন সমাজে এসছে অবক্ষয়। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই আজ মনুষ্যত্বের দীনতার চিত্র। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বড়দের কাছ থেকে ভালো কিছু শেখার আশা করা যায় না। যুব সমাজকে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মতো আজ কোনো পরিকল্পনা নেই, ফলে তারা প্রতিনিয়ত অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসরমান। বস্তুত সমাজের সর্বস্তরে আজ যে সততা, সত্যবাদিতা ও মূল্যবোধের অভাব, তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া যবকদের মাঝে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে।

কর্তব্য: জীবনকে অবশ্যই সত্যবাদিতার মাধুর্যে ম-িত করতে হবে। অন্যায়ের বা অবৈধ উপায়ে যতই বিত্তশালী হোক না কেন তা যে পাপ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অসত্যের পরাজয় আসবেই ও ন্যায়ের পথ চির উজ্জ্বল থাকবেই। সেজন্য সততা ও সত্যবাদিতার অনুশীলন করতে হবে এবং জীবনে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে যথার্থ মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে হবে।

প্রভাব: মহামানবগণ সত্যের অনুসরণে তাঁদের জীবনের মহান সাধনাকে সফল করেছেন। সত্যবাদিতার জন্য যেমন তাঁরা লক্ষ্য অর্জনে সাফল্যলাভ করেছেন, তেমনি সত্যের বলে বলীয়ান হয়ে তাঁরা প্রবল শত্রুকেও পরাজিত করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেছেন। সত্যের সাধনায় মহাপুরুষগণ জীবনকে যেভাবে গৌরবান্বিত করে গেছেন তা মানুষের কাছে মহান আদর্শ হিসেবে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেয়।

উপসংহার: সত্যকে যারা মর্যাদা দেয় না তারা উদার হতে পারে না, তাদের মনে চিরদিন ভয় বিরাজ করে। সত্যবাদিতার মহৎ গুণের অভাবে মানুষের মন সব সময়ের জন্য ছোট হয়ে থাকে। অন্যাদিকে সত্যবাদী মানুষ নির্ভীক হয়, দুর্বার সাহস তার মনে বাসা বাঁধে। সে জন্য সত্যের পথ দৃঢ়ভবে আঁকড়ে থাকতে হবে, আর মনে রাখতে হবে কবিগুরুর অমর বাণী:
মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো,
নিজেরে করো জয়,
দুর্বলেরে রক্ষা করো দুর্জনেরে হানো,
নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো।
মুক্ত করো ভয়,
নিজের ‘পরে পরিতে ভয় না রাখে সংশয়।
 আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ভূমিকা: জাতীয়তার প্রধান উপাদান মাতৃভাষা। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এ ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতার জন্য আমাদের বহু সংগ্রাম এবং জীবন দিতে হয়েছে। ভাষার জন্য আমাদের প্রথম রক্ত দিতে হয়েছে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে UNESCO’র সাধারণ পরিষদে মহান ভাষাদিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’ ঘোষণা করায় বাংলা ভাষা আজ মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

পটভূমি: পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে তার মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর পরই পাকিস্তান সরকার উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৪৭ সালে এক সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু তখনো পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি মানুষ বাংলায় কাথা বলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলায় ভাষার দাবিতে প্রথম বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এতে শেখ মুজিব গ্রেফতার হয়। তাই ১১ মার্চ কে তখন “ভাষা দিবস” হিসেবে পালন করা হত। ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্ণর উর্দুকে পাকিস্তানের এক মাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। সাথে সাথে হয় প্রতিবাদ। ২৪ মার্চ ১৯৪৮ সালে আবার ঘোষনা করা হয় “পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে উর্দু”। তখন থেকে শুরু হয় মহাপ্রতিবাদের আন্দোলন। পরিস্থিতি খারাপ দেখে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে সমগ্র ঢাকায় ১৪৪ ধারা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় শুরু হয় সভা-মিছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সভা আর মিছিলে মিছিলে ভরে গেলে চালানো হয় গুলি এবং শহীদ হন ছালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর সহ আরো অনেকে। এরই প্রেক্ষাপটে মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে  “ভাষা দিবস” পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

স্বীকৃতির উদ্যোক্তা: কানাডান প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠন “Mother Language Of The World” সর্বপ্রথম এ ধরনের উদ্যোগ গহণ করে। কিন্তু জাতিসংঘের পরামর্শ মতে তারা বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করে। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব UNESCO এর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। ১৯৯৯ সালের ২৮ অক্টোবর উনেস্কোর সাধারণ পরিষদে শিক্ষা মন্ত্রি একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ’ ঘোষণা করার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবের পক্ষে ২৭টি দেশ সমর্থন দেয়। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে উনেস্কোর ৩১তম সম্মেলনে “২১শে ফেব্রুয়ারি” কে “আন্তর্জাতিক মার্তভাষা দিবস ’ হিসেবে পালনের স্বীকৃতি পায়। এরই হাত ধরে আজ বাংলা ভাষা পৃথিবীর মধুরতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালত হবে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশ “১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি” তে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। যার মাধ্যমে বিশ্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি ও দেশসহ সকল জাতিই তার মাতৃভাষাকে রক্ষার ও তার ঐতিহ্য বহন করার দৃঢ় শপথে উদ্দীপ্ত হবে।

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ’ এর তাৎপর্য: সাংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণের ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মাতৃভাষার প্রচলন কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহু ভাষাভিত্তিক শিক্ষাকেই উৎসাহিত করবে না। তা ভাষাগত ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের উন্নয়ন ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহনশীলতা ও সংলাপের উপর ভিত্তি করে বিশ্ব সংহতি আরও জোরদান হবে। তাই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ মাতৃভাষার উন্নয়ন ও বিস্তারে সচবছেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এতে পৃথিবীর সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিও তাদের ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হতে উদ্বুদ্ধ করবে। অপর দিকে বাঙালি জাতি হিসেব আমরা পরিচিত হব আন্তর্জাতিক পরিমন্তলে, হব গর্বিত।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন: প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদের বেদিতে শ্রদ্ধাভরে ফুল অর্পণ করি। হৃদয়ের সকল আকুতি পবিত্রতা ও শভ্রতা দিয়ে শহীদের বেদিতে ফুল দিয়ে আমরা উদ্যাপন করি মাতৃভাষা দিবস। আমাদের মত পৃথিবীর ১৮৮ টি দেশেও আমাদের দেশের মত পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। হৃদয়ের সমস্ত শুভ্রতা উৎসারিত করে তারা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আমাদের ভাষা শহীদদের । এর চেয়ে বড় পাওয়া, বড় চাওয়া আর কি আছে আমাদের? সত্যিই আমরা গর্বিত জাতি। আমরা গর্বিত আমাদের মাতৃভাষার জন্য। শহীদরা আমাদের পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের সম্মান জনক স্থানে। সার্থক হয়েছে তাদের রক্তদান। আজ বিশ্ব দরবারে সহস্র প্রাণে বেঁজে ওঠে-

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?”

উপসংহার: মাতৃভূমি একটি প্রস্ফুটিত ফুল আর তার সুবাস হচ্ছে মাতৃভাষা। তাই মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার সাথে মানুষ আবদ্ধ হয় বিনি সুতোর মালার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের। মাতৃভাষাকে আশ্রয় করেই একটি জাতি লালিত ও বিকশিত হয়। জাতীর ভাব, কল্পনা, আত্মার আকুলতা, ব্যাকুলতা, হৃদয়ের প্রেম ভালোবাসা মাতৃভাষার মাধ্যমেই রূপায়িত হয়। তাই মাতৃভাষা মায়ের মত। আর এই মাতৃভাষাকে যারা কেড়ে নিতে চায়, রক্তের বিনিময়ে হলেও তাদের প্রতিহত করতে হয়। তারই ইতিহাস গড়েছিল আমাদের দামল ছেলেরা। আমাদের এই গৌরভ গাঁথা ইতিহাসটিকে শুধু আমরা নই, বিশ্ববাসিও পালন করে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে।
 মানব কল্যাণে বিজ্ঞান

ভূমিকা: বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রার এক যুগান্তকারী যুগ। একদা গুহাবাসী, অরণ্যচারী মানুষ বিজ্ঞানের বদৌলতে আজ ছুটে চলেছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অভাবনীয় বেগ, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে করেছে দ্রুততর ও বহুমাত্রিক। ঘুচিয়ে দিয়েছে দূর-দূরান্তরের ব্যবধান। মানুষকে দিয়েছে অনিঃশেষ সম্ভাবনার অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা।
বিজ্ঞানের উদ্ভব: বিজ্ঞান শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান। অতি প্রাচীনকালে মানুষের বিশেষ কৌতূহলের চেতনায় বিজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটেছিল। প্রাকৃতিক নানা বিষয় সম্পর্কে অন্বেষু দৃষ্টি মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রেরণা সঞ্চারিত করেছে। আর এই প্রেরণাই মানুষকে পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে এবং বিজ্ঞানকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

মানব সভ্যতায় বিজ্ঞান: প্রাচীন কালে, বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মানুষ ছিল প্রকৃতির হাতের এক অসহায় ক্রীড়নক। গুহাবাসী সেই পশুসদৃশ মানুষ যখন প্রথম পাথর ঘষে আগুন জ্বালায় তখন থেকেই শুরু হয় মানুষের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। তারপর সেখানেই বাধার সম্মুখীন হয়েছে, কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, মানুষ ব্যবহার করেছে বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ এখন সমগ্র পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। বিজ্ঞানই মানুষকে গুহাবাসী অবস্থা থেকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করেছে।

বিজ্ঞানীর আত্মত্যাগ: বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানব সভ্যতাও অগ্রগতির দিকে এগিয়েছে। অতীতের সাথে বর্তমান পৃথিবীর তুলনা করলে এ সম্পর্কে কোনো সংশয় থাকে না। কিন্তু এই উন্নতির পেছনে অসংখ্য বিজ্ঞানীর অবদান সম্পর্কে চিন্তা করলে আপনা থেকেই আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। সত্য কথা বলেছিলেন বলে ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, ল্যাভয়সিয়েকে হত্যা করা হয়েছিল গিলোটিনে। মহান বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস, কোপর্নিকাস, গ্যালিলিও প্রমুখ অসংখ্য বিজ্ঞানী তাঁদের সমগ্র জীবন বিজ্ঞানের পিছনে ব্যয় করেছেন। তাঁদের অক্লান্ত সাধনার পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানে মানুষ এক অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের যুগে উন্নীত হয়ে সক্ষম হয়েছে।

মানব জীবনে বিজ্ঞানের বহুমাত্রিক অবদান: বর্তমান যুগে, মানব জীবনের বিভিন্ন শাখায় বিজ্ঞানের বহুবিধ অবদান পরিলক্ষিত হচ্ছে। যাতায়াত, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ মানব জীবনের বহুক্ষেত্রে বিজ্ঞান এক বিশাল ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানকে এখন বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর ফলে বিজ্ঞানকে মানব জীবনের বহুক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

কৃষি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: মানব সভ্যতার সূচনা লগ্নে মানুষ তার বৈজ্ঞানিক চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উর্বর জমিতে কৃষিকাজের উপায় উদ্ভাবন করে। বিজ্ঞানের বদৌলতে সেই কৃষিতে মানুষ এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মানুষ আবিষ্কার করেছে ট্রাক্টরসহ নানা রকম কৃষি সরঞ্জাম। আগে যেখানে নদী থেকে পানি তুলে সেচ দিতে হত, এখন তার পরিবর্তে মানুষ পাম্প ব্যবহার করে ভূঅভ্যন্তর থেকে পানি উত্তোলন করে সেচ কাজ সম্পন্ন করছে। কীটনাশকের সাহায্যে পোকামাকড় ও পঙ্গপালের হাত থেকে ফসল রক্ষা করছে। বর্তমানে ক্লোনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা উন্নত জাতের অধিক উৎপাদনশীল বীজ তৈরি করেছেন। এর ফলে মরুভূমির মতো উষর জায়গায় কৃষিকাজ সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনাবৃষ্টির অঞ্চলে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এভাবে খাদ্য উৎপাদনে বিজ্ঞান বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে।

যাতায়াত ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: বিজ্ঞান আর দূর-দূরান্তরকে করেছে নিকট। বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ আবিষ্কার করেছে দ্রুতগামী যানবাহন, বুলেট ট্রেন, শব্দাতিগ উড়োজাহাজ। আজ মানুষ পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে অপর প্রান্তের মানুষের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে পারে। টেলিভিশন, ফ্যাক্স, রেডিও, ই-মেইল ইত্যাদির মাধ্যমে সারা বিশ্বের খবর যে-কোনো মুহূর্তে পেয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, রকেটে করে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে পাড়ি জমাতে প্রস্তুত এখন মানুষ। পৃথিবীর বাইরের কৃত্রিম উপগ্রহগুলো হল বর্তমানের সর্বাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন নামক এই প্রক্রিয়ার দ্বারা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের খবরাখবর, তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করা যায়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে আলোক তন্তু নিয়ে এসেছে নতুন প্রযুক্তি। এর ফলে টেলিফোনে কথা বলার পাশাপাশি পরস্পরের ছবি দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেন করা যাচ্ছে কম্পিউটারের তথ্যাবলি। এভাবে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি সারা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাফল্যগুলোও কম বিস্ময়কর নয়। জন্মপূর্ব রোগ নির্ণয়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় রকমের উত্তরণ ঘটেছে। জিন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা প্রয়োগিক ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্ভাবনা হাজির করেছে। কর্নিয়া (অক্ষিগোলকের স্বচ্ছ আবরণ), বৃক্ক, অস্থিমজ্জা, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এবং যকৃতের মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাফল্য অভাবনীয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফাইবার অপটিকস্ (আলোক তন্তু বিদ্যা) ব্যবহারের ফলে মানবদেহের অভ্যন্তরস্থ ফুসফুস, পাকস্থলী, বৃহদন্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র, উদর, অস্থিগ্রস্থি, শিরা, ধমনী ইত্যাদির অবস্থা যন্ত্রের সাহায্যে অবলোকন করে নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়। শুধু তাই নয়, অপটিক ফাইবার (আলোক তন্তু) সংবলিত বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্যে নমুনা সংগ্রহ করা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তুসামগ্রী ও ছোট ছোট টিউমার অপসারণ করা যায়। অতিকম্পনশীল শব্দ ও লেজারকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে। এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের অবস্থা দেখা যেমন সম্ভব হচ্ছে তেমনি মূত্রথলি ও পিত্তকোষের পাথর চূর্ণ করার কাজেও এর সফল ব্যবহার হচ্ছে। বহুমূত্র রোগীর অন্ধত্ব প্রতিরোধে ব্যবহৃত হচ্ছে লেজার রশ্মি। এই রশ্মি কোষকলা ছেদনে ও রক্তবাহী নালিকার ভেতরে জমে ওঠা প্রলেপ অপসারণেও সাহায্য করছে। কম্পিউটার প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নিয়ে এসেছে সর্বাধুনিক পর্যায়ে। এর মাধ্যমে ছবি তুলে রোগ নির্ণয় সম্ভব হচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: শিক্ষা ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর প্রায় সবই বিজ্ঞানের উদ্ভাবন। বর্তমানে বিজ্ঞান শিক্ষা-ব্যবস্থাকে করেছে আরও আধুনিক ও উন্নত। এখন বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে রেডিও-টেলিভিশন শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটার বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করেছে এক নতুন শিক্ষা পদ্ধতি। বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা এখন কম্পিউটারেই শিখতে পারছে অসংখ্যা জিনিস। তাছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন বিখ্যাত লাইব্রেরির বই পাঠ করা যায় এবং প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন বিদেশী শিক্ষকের কাছ থেকে পড়ালেখা সম্পর্কে পরামর্শও গ্রহণ করা যায়।

আবহাওয়ায় বিজ্ঞান: মানুষের জীবনযাত্রার প্রায় সব কাজই নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। আর এই আবহাওয়ায় খবরাখবর বের করতে গিয়ে বিজ্ঞান তার প্রচণ্ড ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বৈজ্ঞানিকরা মহাকাশে এমন কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণ করেছেন যেগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে প্রতিদিনই তৈরি করছে পৃথিবীর মানচিত্র। ৭/৮ দিন আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে আসন্ন ঘূণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা এখন সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণে। তাছাড়াও কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে খনিজ সম্পদ, তেল ও গ্যাসের উৎস, মাটির উপাদান ও জলজ সম্পদ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে পঙ্গপালের আক্রমণের আশঙ্কা সম্পর্কে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কৃত্রিম আবহাওয়া তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। যেমন, মানুষ এখন কৃত্রিম বৃষ্টি নামাতে পারে, রঙ্গিন ধোঁয়া দিয়ে আকাশের গায়ে রংধনুও ‍সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া বাঁধ দিয়ে মানুষ এখন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থামিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে। এমন দিন দূরে নয় যেদিন মানুষ আবহাওয়ার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে। আর তা কেবলই সম্ভব হতে পারে বিজ্ঞানের বদৌলতে।

বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ: বিজ্ঞান মানব সভ্যতার উন্নতির সর্ববৃহৎ হাতিয়ার। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানব জীবন হয়েছে সহজ ও স্বচ্ছল। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান শুধুমাত্র মানুষের উপকারই করে নি। স্বয়ংক্রিয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্র মানুষের কাজ সম্পাদন করতে শুরু করার পরপরই অসংখ্য মানুষ বেকারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের এক বিশাল জনসমষ্টির রুজি-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রসম্বলিত বড় বড় শিল্প- কারখানা ও মোটরচালিত গাড়িগুলো নষ্ট করছে পরিবেশ। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ অনেক সময় পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করছে। অ্যারোসল স্প্রে, ফ্রিজ ইত্যাদি হতে নির্গত পদার্থ পৃথিবীর ওজন স্তরকে ফুটো করে দিচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছে ও মেরুদ্বয়ের বরফ গলা শুরু হয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভয়াবহতা পৃথিবীর মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ করেছিল প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। এ সময় মানুষ বিজ্ঞানের অপব্যবহার দেখে চমকে উঠেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে অসংখ্য শহর-বন্দর ধ্বংস কর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যত যাই হোক, বিজ্ঞানের অবদানকে মানুষ কখনই অস্বীকার করতে পারবে না। বরং বিজ্ঞানের অপব্যবহার রোধে সচেষ্ট হলে তা মানব জীবনে আরও ফলপ্রসূ প্রভাব বিস্তারের সক্ষম হবে।

উপসংহার: “বিজ্ঞান যেন এ যুগের তিলোত্তমা স্বরূপিনী যার এক হাতে আছে অমৃত ভাণ্ডার কিন্তু তার নয়ন কটাক্ষে প্রলয় ঘটে যায়।” মানুষের জীবনে তাই বিজ্ঞানের সার্থক ও ইতিবাচক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানের আলোকে মানবজীবন আলোকিত করতে হবে। বিজ্ঞানের অপব্যবহার রোধে সকল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমেই মানবজাতির কল্যাণ সাধিত হবে।

   অধ্যবসায়

ভূমিকা:
‘কেন পান্থ ক্ষান্ত হও, হেরি দীর্ঘ পথ
উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?’
                                                                       - কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার

সময়ের সাথে জীবন, জীবনের সাথে কর্ম ও অধ্যবসায়- একই বিনিসুতোর মালায় গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। এ পৃথিবীতে যে-কোনো কাজ করতে গেলেই সফলতা ও নিষ্ফলতা উভয় প্রকার ঘটনাই ঘটে থাকে। অধ্যবসয় সফলতার চাবিকাঠি। অধ্যবসায় ছাড়া মানবজীবনে উন্নতির আশা কল্পনা মাত্র।
অধ্যবসায় কী ও বৈশিষ্ট্য: মানুষ জীবনকে সাজাতে চায়, সফল করতে চায় কিন্তু জীবনের পথ খুব সহজ নয়। জীবনের সব কাজই সহজে সমাধা হয় না। অনেক কাজেই প্রথমবারে সফলতা আসে না। এমনকী পরের বারও তার সফলতা নাও আসতে পারে। কিন্তু এতে হতাশ হলে চলবে না। বার বার চেষ্টা করতে হয়। তাতে এক সময় না একসময় সাফল্য আসবে। সাফল্য লাভের এই প্রয়াসই অধ্যবসায়। এই ধারণাকে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রবাদতুল্য একটি কবিতায়:

‘পারিব না, পারিব না এ কথাটি বলিও না আর,
পারো কি না পারো করো যতন আবার।
একবার না পারিলে দেখ শতবার।’

কোনো কাজে সফলতা অর্জন করতে হলে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা করার নামই অধ্যবসায়। অধ্যবসায় হচ্ছে কতিপয় গুণের সমষ্টি। চেষ্টা, উদ্যোগ, আন্তরিকতা, পরিশ্রম, ধৈর্য ইত্যাদি গুণের সমন্বয়ে অধ্যবসায় পরিপূর্ণতা লাভ করে। মনের আস্থা ও বিশ্বাসকে বাস্তব রূপদানের জন্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের মধ্য দিয়ে ঈস্পিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর মধ্যেই অধ্যবসায়ের সার্থকতা নিহিত। প্রসঙ্গত কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলেছেন-

‘কেন পান্থ ক্ষান্ত হও, হেরি দীর্ঘ পথ
উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?’
অধ্যবসায়ের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা: মানবসভ্যতার মূলে রয়েছে অধ্যবসায়ের এক বিরাট মহিমা। মানবজীবনের যে-কোনো কাজে বাধা আসতে পারে, কিন্তু সে-বাধাকে ভয় করলে চলবে না, কেননা ‘জীবনের সমস্যাকে এড়িয়ে যাবার অর্থ হচ্ছে, জীবনকে অস্বীকার করা’ (-জন লিলি)। রাতের আঁধার পেরিয়ে যেমন দিনের আলো এসে দেখা দেয়, ঠিক তেমনি বার বার অবিরাম চেষ্টার ফলেই মানুষের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় সাফল্যের শুকতারা। অধ্যবসায়ের গুণেই মানুষ বড় হয়, অসাধ্য সাধন করতে পারে। সকল ধর্মগ্রন্থে অধ্যবসায়কে একটি চারিত্রিক গুণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিশ্বাস, মেধা, সুযোগ কোনো কিছুই চূড়ান্ত সার্থকতা এনে দিতে পারে না যদি না তাদের যথার্থ প্রয়োগে অধ্যবসায়কেই মুখ্য করে তোলা হয়। একমাত্র অধ্যবসায়ী ব্যক্তির পক্ষেই এসব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া সম্ভবপর। নিজেকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে এবং দেশ, জাতি ও বৃহত্তর মানবসমাজের জন্যে তাকে কিছু-না-কিছু অবদান রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে অধ্যবসায়ের কোনো বিকল্প নেই। যে অধ্যবসায়ী নয় মনের দিক থেকে সে পঙ্গু। ফলে সমাজে তার দ্বারা কোনো মহৎ কাজ সম্ভব নয়। বস্তুত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিরাশা বা ব্যর্থতাকে জয় করার প্রধান উপায় হচ্ছে অধ্যবসায়- “Failure is the pillar of success”

অধ্যবসায়ের উদাহরণ: জগতে যত বড় শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, সেনানায়ক, ধর্মপ্রবর্তক রয়েছেন, তাঁদের সবাই ছিলেন অধ্যবসায়ী। ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে তার দৃষ্টান্ত। মহাকবি ফেরদৌসি দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে রচনা করেছিলেন অমর মহাকাব্য ‘শাহনামা’। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দশ বিশ বছরের একক প্রচেষ্টায় রচনা করেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি শব্দ সংবলিত বাঙলা ভাষার অভিধান। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজের চেষ্টা ও সাধনায় দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে সংগ্রহ করেছিলেন দু’হাজার প্রাচীন পুঁথি, যার ফলে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রায় চার’শ বছরের ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উদ্ঘাটিত হয়। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে বেরোয় জনসনের বিখ্যাত অভিধান ‘এ ডিকশনারি অফ দি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ’ যাকে ইংরেজ জাতি গ্রহণ করে এক মহৎ কীর্তিরূপে : ফরাসিরা যা সম্পন্ন করেছে একাডেমির সাহায্যে ইংরেজ তা করেছে এক ব্যক্তির শ্রমে-মেধায়, এ-তৃপ্তি পাওয়ার সাথে সাথে ভাষার মানরূপ শনাক্তির জন্যে একাডেমি প্রতিষ্ঠার সমস্ত স্বপ্ন ত্যাগ করে ইংরেজ। মনীষী কার্লাইল অনেক বছরের শ্রমে ফরাসি বিপ্লবের এক অসামান্য ইতিহাস লিখেছিলেন। এ-সবই অধ্যবসায়ের ফসল। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস অধ্যবসায়ের আর এক জীবন্ত উদাহরণ। অগণিত ইংরেজ সৈন্যের সাথে পুনঃপুন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েও রবার্ট ব্রুস ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করার বাসনা ও চেষ্টা পরিত্যাগ করেন নি। বরং একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের ফলে তিনি যুদ্ধে জয়ী হন। এমনিভাবে স্যার ওয়াল্টর স্কট প্রমুখ ব্যক্তিগণও বার বার ব্যর্থ হয়েও অধ্যবসায়ের দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। মহাবিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন নিজেই স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের মূলে আছে বহু বছরের একনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন শ্রম। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, “Impossible is a word, which is only found in the dictionary of fools.”

অধ্যবসায়ীর জীবনাদর্শ: জীবনসংগ্রামে সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র হচ্ছে অধ্যবসায়। অর্ধ পৃথিবীর অধীশ্বর নেপোলিয়ন তাঁর জীবনকর্মের মধ্য দিয়ে রেখে গেছেন অধ্যবসায়ের অপূর্ব নিদর্শন। কোনো কাজকে তিনি অসম্ভব বলে মনে করতেন না। তাই তিনি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ফরাসি জাতির ভাগ্যবিধাতা হতে পেরেছিলেন। শুধু অধ্যবসায়ের বলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীগণ বিশ্বখ্যাত হয়েছেন।

পক্ষান্তরে, অধ্যবসায়ের অভবে অনেক সম্ভাবনাময় জীবনও অকালে ঝরে যায়। অধ্যবসায়হীন ব্যক্তি জগতের কোনো কাজেই সফলতা লাভ করতে পারে না। তার জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অধ্যবসায়ীকে কখনোই অসহিষ্ণু হলে চলবে না। অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতাকে অর্জন করা যেমন সম্ভব তেমনি যোগ্যতার বলে অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যাওয়াও বিচিত্র নয়। এক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে জরুরি তা হচ্ছে নিজের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা। তাই অধ্যবসায়ী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে কবি বলেছেন-

‘ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো! বাঁধো বাঁধো বুক,
শত দিকে শত দুঃখ আসুক আসুক।’
ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব: বিধাতা প্রত্যেক মানুষকেই প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিভাকে বিকশিত করার বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন। মানবজীবনের এই সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে হলে অধ্যবসায়ের কোনো বিকল্প নেই। অনেকের ধারণা- অসাধারণ প্রতিভা ছাড়া কোনো বড় কাজে সফলতা সম্ভব নয়। কিন্তু অসাধারণ প্রতিভা ছাড়াও নিরলস পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের দ্বারা যে কোনো কাজে জয়যুক্ত হওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক নিউটন বলেছেন- ‘আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়, বহু বছরের চিন্তাশীলতা ও পরিশ্রমের ফলে দুরূহ তত্ত্বগুলোর রহস্য আমি ধরতে পেরেছি।’

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন- ‘প্রতিভা বলে কিছুই নেই। পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও, তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে’।

ডালটন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘লোকে আমাকে প্রতিভাবান বলে, কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া কিছুই জানি না’

তাই প্রতিভা লাভ করতে হলে অধ্যবসায়ী হওয়া প্রয়োজন, এবং প্রতিভাকে অধ্যবসায়ের গুণে কাজে লাগাতে হবে, অন্যথায় সে-প্রতিভা কোনো কাজে আসবে না।
ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব: ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব সর্বাধিক। ছাত্রজীবন আর অধ্যবসায় মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। বিদ্যার্জনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। অলস, কর্মবিমুখ ও হতাশ ছাত্র-ছাত্রী কখনও বিদ্যালাভে সফলতা অর্জন করতে পারে না। একজন অধ্যবসায়ী ছাত্র বা ছাত্রী অল্প মেধাসম্পন্ন হলেও তার পক্ষে সাফল্য অর্জন করা কঠিন নয়। কাজেই অকৃতকার্য ছাত্র-ছাত্রীকে হতাশ না হয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে অধ্যবসায়ে মনোনিবেশ করা উচিত। এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন,
‘কোন কাজ ধরে যে উত্তম সেই জন
হউক সহস্র বিঘ্ন ছাড়ে না কখন।’

শুধু অধ্যবসায়ই পারে ব্যর্থতার গ্লানি মুছে দিয়ে সাফল্যের পথ দেখাতে।

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব: মানুষ বিদ্যুৎ আবিষ্কার করে দূর করেছে আঁধার, বিমান আবিষ্কার করে জয় করেছে আকাশ, রকেটের সাহায্যে অর্জন করছে চন্দ্র বিজয়ের গৌরব। আর এসব সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে মানুষের যুগ যুগান্তরের সাধনা, তাঁর অবিরাম অধ্যবসায়। বর্তমান সভ্যতার যুগে মানুষ নিজ নিজ কৃষ্টি ও সভ্যতা অর্জন করতে চায়, পৌঁছতে চায় সভ্যতার চরম শিখরে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় তা সহজে হয়ে ওঠে না। কোনো সভ্যতাই একদিনে গড়ে ওঠে নি। বার বার চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সৃষ্টির প্রথম মানবগোষ্ঠীর সভ্যতাও স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে। বস্তুত সামগ্রিকভাবে একটি জাতির সগৌরবে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সকল নাগরিককেরই অধ্যবসায়ী হওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর বুকে তখনই মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে সগৌরবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ সম্ভব যখন জাতীয় উন্নয়নে দল মত নির্বিশেষে সবাই সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করবে। তাই জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

অধ্যবসায় ও উন্নত বিশ্ব: উন্নত বিশ্ব আজ অধ্যবসায়ের বলে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছেছে। জাপান, কোরিয়া, আমেরিকা, কানাডা কেবলমাত্র অধ্যবসায়ের গুণেই উন্নতির শীর্ষস্থান করছে।

অধ্যবসায় ও বাঙালি জাতি: আমরা বাঙালি জাতি। দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য যে, আমাদের অনেকের মধ্যে অধ্যবসায়ের মহৎ গুণটি অনুপস্থিত। আমাদের মধ্যে নেই কোনো প্রচেষ্টা, নেই কোনো উদ্যম, কোনো আগ্রহ। বরং আছে আস্ফালন, হুঙ্কার, গরিমা ও নিজেকে প্রকাশ করার মিথ্যে বাহাদুরী। কেবলমাত্র অধ্যবসায়ের অভাবে আজ আমরা এত পিছিয়ে আছি। জাতি হিসেবে আমরা তাই অনুন্নত। সতরাং আর একটি মুহূর্তও বিলম্ব না করে নিজেদেরকে অধ্যবসায়ী রূপে গড়ে তোলা খুবই জরুরি।

উপসংহার:
‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’
-অধ্যবসায় সম্পর্কিত একটি পরম সত্য প্রবাদ। যে ব্যক্তি অধ্যবসায়ী নয়, সে জীবনের কোনো সাধারণ কাজেও সফলতা লাভ করতে পারে না। জীবনের সফলতা এবং বিফলতা অধ্যবসায়ের ওপরই নির্ভর করে, তাই আমাদের সকলের উচিত অধ্যবসায়ের মতো মহৎ গুণটিকে আয়ত্ত করা, পরশপাথরের মতো এই পাথরটিকে ছুঁয়ে দেখা এবং সোনার কাঠির মতো একে অর্জন করা। মনে রাখতে হবে অধ্যবসায়ই জীবন, জীবনই অধ্যবসায়।