স্বাধীনতা,
এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো
|
অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী পরীক্ষা, রচনামূলক অংশের সকল বিষয়, সৃজনশীল প্রশ্ন, শিক্ষা, সাহিত্য, কবিতা ও স্বাস্থ্যবিধি
স্বাধীনতা,
এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো
|
আমার
পরিচয়
|
|
মাগো, ওরা বলে --আবু জাফর ওবাইদুল্লাহ “কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, গল্প শুনতে দেবে না। |
|
শোন একটি মুজিবরের থেকে --গৌরী
প্রসন্ন মজুমদার |
|
রৌদ্র
লেখে জয় – শামসুর রাহমান বর্গি
এলো খাজনা নিতে, |
মুক্তির ছড়া |
আমি
হব
|
অপসংস্কৃতি ও বর্তমান যুবসমাজ
ভূমিকা: সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনা
করতে গিয়ে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন- “সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা” অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য মানুষের
নৈমিত্তিক প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি, আর অপসংস্কৃতি হলো এর বিপরীত। আত্মার মৃত্যু ঘটিয়ে
অসুন্দরের উপাসনা করে, অকল্যাণের হাত ধরে বেঁচে থাকাই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি মানুষকে
কলুষিত করে এবং জীবনের সৌন্দর্যের বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়ে শ্রীহীনতার দিকে ঠেলে দেয়।
জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক: জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সমাজে বসবাসরত মানুষের প্রত্যেকটি কার্যকলাপই তাদের সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। কোনো সমাজই তাদের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে পারে না। মূলত সংস্কৃতি এবং জীবন একে অপরের পরিপূরক।
অপসংস্কৃতির উৎস: উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতি উদ্দাম ভোগ-বিলাসিতা ও উচ্ছ্বংখলতার জন্ম দেয়। নতুন সংস্কৃতির উন্মত্ততায় সে সময়ে যে অনাচার ও উচ্ছৃংখলতা দেখা দিয়েছিল সেগুলোকে বর্জন করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সদর্থক ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিল সমাজ-সংস্কারক বাঙালি মনীষীরা। বর্তমানে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার অবাধ সুযোগে আমাদের জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পাশ্চাত্য যুবসমাজ যে মাদক নেশা ও অবক্ষয়ে আক্রান্ত, আকাশ-সংস্কৃতির মাধ্যমে তা ক্রমবিস্তার লাভ করছে আমাদের তরুণ সমাজে। অসংযত পাশ্চাত্য মানসিকতা, উগ্র বিদেশিয়ানা ও ভোগপ্রবণ স্থূলতা আজ আমাদের সংস্কৃতির মূলধারাকে গ্রাস করতে বসেছে। বৈদেশিক সংস্কৃতির নির্বিকার গ্রহণ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য এখন হুমকিস্বরূপ।
জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির অশনি সংকেত: বাংলাদেশে জাতীয় জীবনে অপসংস্কৃতির প্রবল প্রতাপ লক্ষনীয়। অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার এক উদ্ভট জোয়ার চলছে এ দেশে। বিশেষত এ দেশের তরুণ সমাজ আজ দিকভ্রান্ত, দিশেহারা। তাদের বেঁচে থাকার সাথে নীতির সম্পর্ক নেই। এই বোধ থেকেই অপসংস্কৃতির জন্ম হয়। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা এখন হাস্যকর দুর্নীতি এখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আর এখন অনৈতিকতার সূত্রপাত হচ্ছে মানুষের অসৎ জীবিকার্জনের হাত ধরে। সৎভাবে যে জীবিকার্জন না করে তার পক্ষে অপসংস্কৃতির দাসত্ব ছাড়া উপায় নেই। প্রতিদিনের সংবাদপত্র আমাদের সামনে যে চালচিত্র তুলে ধরে, তাতে অপসংস্কৃতির আগ্রাসন অতি স্পষ্ট। অশ্লীলতা, নোংরামি, খুন, ছিনতাই, প্রতারণা- সবই অপসংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নাম। আমাদের সমাজ আজ এসবেরই দাসত্ব করে চলেছে।
অপসংস্কৃতি ও আমাদের যুবসমাজ: সমাজবিজ্ঞানী E.B Taylor বলেন- “Calture perrersion might lead the youth gearation.” আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু অপসংস্কৃতি তাদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যুবসমাজ শুদ্ধ সংস্কৃতি সাধনার পথ থেকে বিচ্যুত। তারা অসুন্দর ও কলুষিত সংস্কৃতি তথা অপসংস্কৃতির শিকার। যুবসমাজের একটা বড় অংশকে সুকৌশলে করা হয়েছে আদর্শভ্রষ্ট। সুন্দর জীবনের পথ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্ধকার জীবনের পথে। তারা তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার জগতে, অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। বিপুল সংখ্যক তরুণের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে অস্ত্র, জড়িয়ে ফেলা হয়েছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ডে। তারা লিপ্ত হচ্ছে অসামাজিক কাজে। হিংসাশ্রয়ী-অশ্লীল চলচ্চিত্র, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী বিকৃত রুচির নাচ-গান, রুচিগর্হিত পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি তাদেরকে আকৃষ্ট ও অনুরক্ত করার গভীর নীলনকশা ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে।
পোশাক-পরিচ্ছদের উপর প্রভাব: পোশাক-পরিচ্ছদে আমাদের নিজস্ব একটি ঐতিহ্য ছিল। বিদেশি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ও চর্চা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। জিন্স, টি-শার্ট, স্কার্ট এখন আমাদের ছেলেমেয়েদের খুবই প্রিয়। শাড়ি-লুঙ্গি কিংবা পাজমা-পাঞ্জাবি এখন আর তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। আমাদের মেয়েদের অনেকেই স্বল্পবসনকে আধুনিক জীবনের নমুনা বলে ভুল করে। পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের ফলে তারা একদিকে যেমন আধুনিক জীবনের ধারাকে ধরতে পারে না তেমনি দেশীয় সংস্কৃতির সাথেও নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে তারা একটি দোদুল্যমান অবস্থায় পতিত হয় অবশেষে জীবন হয়ে পড়ে লক্ষ্যহীন ও হতাশাপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসের উপর প্রভাব: বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে যুবসমাজে খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। কোনো খাবারের পুষ্টিমান বিবেচনা না করে টেলিভিশন চ্যানেলে খাবারের বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের নতুন প্রজন্ম তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতির নতুন সংযোজন হচ্ছে ফাস্টফুড সংস্কৃতি। বর্তমানে তরুণ-তরুণীসহ শিশু-কিশোর এমনকি বয়স্কদের মাঝেও এ সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে। যা বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব খাবারগুলোকে ক্রমান্বয়ে অস্বীকার করার প্রবণতা তৈরি করছে।
ভাষা ও সংলাপের উপর প্রভাব: বিশ্বায়নের আর একটি প্রত্যক্ষ ও বাহ্যিক প্রভাব আমাদের তরুণ প্রজন্মের কথাবার্তার পরিবর্তন। বর্তমান শিশুরা বাবা-মাকে বাংলা ভাষায় সম্বোধন না করে বিদেশি ভাষা বিশেষত ইংরেজিতে পাপা, মাম্মি বা মম ডাকতে আগ্রহী। কথায় কথায় তারা অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করে। বাংলা ইংরেজি, হিন্দি একসাথে মিলিয়ে পরস্পরের সাথে কথা বলে, একে তারা আধুনিকতা মনে করে। তাছাড়া বাংলা শব্দের বিকৃতি এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর প্রভাব: বিদেশি সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় জীবনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে চরমভাবে আঘাত করছে, সেটি হলো আমাদের ধর্মীয় জীবনবোধ ও নৈতিক শিক্ষা। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচারের ফলে আমাদের যুবসমাজে ধর্মনিষ্ঠা এবং নৈতিকতা বোধ ক্রমহ্রাসমান। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা আর অ্যালকোহলিক সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতির পরিপন্থী। সুখী সুন্দর ও শান্তিময় জীবনের জন্য এসব কিছুর চেয়ে ধর্মীয় জীবনের নীতি অনুসরণ খুবই জরুরি। বিদেশি সংস্কৃতির আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
অপসংস্কৃতি রোধের উপায়: পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে বিশ্ব সম্রাজ্যের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় আমাদের নেই। তাই এর মধ্যে থেকেই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আর স্বার্থকে বাঁচিয়ে রেখে চলতে হবে। যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুব সমাজের এই বিপথগামিতা, সেই পরিবেশের আমূল সংস্কার অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সকল শ্রেণির মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে অপসংস্কৃতির বেসাতি। তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে নতুন মূল্যবোধে। সুযোগ দিতে হবে আত্মবিকাশের। মনে রাখতে হবে, আদর্শভ্রষ্টতাই এ কালের যুব সমাজের একমাত্র চিত্র নয়। এক শ্রেণির যুবসমাজ বেশ সক্রিয়, সজাগ ও আদর্শবাদী। সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক শঠতা সবকিছুর বিরুদ্ধেই এরা সোচ্চার। তাই আজ যারা অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে গিয়ে অলস তন্দ্রায় আচ্ছন্ন, সঠিক পথনির্দেশনা পেলে এই যুবসমাজই আবার উজ্জীবিত হবে দুর্বার প্রাণশক্তিতে। ফিরে পাবে তাদের হারানো শুভবুদ্ধি। যুবসমাজকে অপসংস্কৃতি থেকে রক্ষা করতে হলে বিদেশি সংস্কৃতির দরজা বন্ধ করে নিজেদেরকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে হবে। দেশীয় সংস্কৃতির লালন করতে হবে। আর বিদেশি সংস্কৃতির মোকাবেলায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় সংস্কৃতিকে করে তুলতে হবে যুগোপযোগী। বিদেশি সংস্কৃতি অনুসরণ ও অনুকরণের ক্ষেত্রে আরও বেশি সজাগ হতে হবে। বিজাতীয় করুচিপূর্ণ সংস্কৃতি বন্ধের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রকাশই আভিজাত্যের পরিচায়ক তরুণদের এ ধারণা ঘোচাতে হবে।
উপসংহার: সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে যুবসমাজকে অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যুবশক্তির পুনরুজ্জীবনে চাই শুভ সুন্দর জীবনের নবতর দীক্ষা। মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানবপ্রেমে ব্রতী করে যুবসমাজকে পরিচালিত করতে হবে সামাজিক অন্যায়-অবিচার, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক শঠতার বিরুদ্ধে।
--- সমাপ্ত ---
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান
ভূমিকা: পৃথিবীতে যেইদিন থেকে মানবজাতির পথ চলা শুরু হয়েছে সেই দিন থেকেই মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে বিজ্ঞান অনস্বীকার্য প্রভাব রেখে গিয়েছে। মানুষ তার উন্নত বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানকে প্রতিনিয়ত প্রয়োগ করেছে জীবনের নানা ক্ষেত্রে। সুকৌশলে বানানো প্রস্তর যুগের অস্ত্রাদি থেকে শুরু করে মানবসভ্যতায় বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়া আগুন; সবকিছুই বিজ্ঞানের দান।
এই বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই মানুষ আবিষ্কার করেছে চাকা, অট্টালিকা তথা উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা নির্মাণের কৌশল আয়ত্ত করেছে। উন্নত বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রয়োগমূলক বিজ্ঞানের সিঁড়ির ওপর ভর করেই মানুষ আজ সভ্যতার শিখরচুড়ায় অধিষ্ঠান করছে। আজকের এই আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনাকাল হিসেবে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পরবর্তী পর্বকে মোটামুটি চিহ্নিত করা যায়।
আজকের দিনে বিজ্ঞানের নতুন নতুন আশ্চর্যকর আবিষ্কার মানুষের জীবনধারাকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে, বদলে দিচ্ছে মানসিকতাকেও। অসুস্থ মানুষ আজ আর রোগ নিরাময়ের জন্যে ওঝার কাছে ছুটে যায়না। প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মন্দিরে মাথা ঠোকেনা। বিজ্ঞানের দানে আজ ভগবানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন চিকিৎসক। রাত্রির কালো অন্ধকারে আর মানুষ পথ হারায় না, রাত্রি এখন আলোকজ্জ্বল। প্রতিদিনের জীবনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সমস্ত কিছুর মধ্যেই রয়েছে বিজ্ঞানের অবদান।
বিজ্ঞানের উৎস: বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ হল বিশেষ জ্ঞান। অর্থাৎ নামের ব্যাখ্যা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে পৃথিবীতে বিজ্ঞান অলৌকিক ইন্দ্রজাল কিংবা ভোজবাজির খেলা নয়। এ হলো বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর মধ্যে স্থিত বিভিন্ন উপাদানকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা। বিজ্ঞানের দান হিসেবে যে সমস্ত আবিষ্কার আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের নিয়ত সরলীকরণ করে চলেছে তার পেছনে রয়েছে মানুষের প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং নানান প্রাকৃতিক উপাদানের মেলবন্ধন। এই দুইই বিজ্ঞানের প্রকৃত উৎস। মানব সভ্যতায় বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু পাথরে পাথর ঘষে সেই আগুন আবিষ্কার থেকে। তারপর থেকেই মানবজগৎ তথা সমগ্র পৃথিবীর জীবকুল বিজ্ঞানের খারাপ-ভালো উভয়প্রকার ফল ভোগ করে আসছে।
রোজকার জীবনে বিজ্ঞানের বিবর্তন: সেই প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের প্রতিদিনকার জীবনে বিজ্ঞান অনস্বীকার্য অবদান রেখে চলেছে। সেই সময় প্রতিদিনকার খাবার সংগ্রহ থেকে শুরু করে আত্মরক্ষা আশ্রয় সবকিছুর জন্যই মানুষ সাধারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর নির্ভর করত। সময় যত এগিয়েছে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ততই পরিবর্তন ঘটেছে। খাদ্য সংগ্রহ কথা আশ্রয়ের মত প্রাথমিক প্রয়োজন মিটিয়ে মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে জীবনের আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে।
আজকের যুগে মানুষ সেই প্রচেষ্টারই বহুমুখী পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে মাত্র। আজ আধুনিক জীবনের চরম উৎকর্ষের এবং অফুরন্ত ঐশ্বর্যের মূলে রয়েছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের অবদানে আমাদের জীবন আজ পরিপূর্ণ। প্রতিদিনকার জীবনে আধুনিক বিজ্ঞানের এই ব্যবহারিক প্রয়োগ আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস তথা মননকেও আমূল বদলে দিচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ হলে আমাদের জীবন অচল হয়ে পড়ে।
শহর অঞ্চলের মানুষেরা মুহূর্তের জন্য নিজেদের জীবনকে ইন্টারনেটবিহীন ভাবতে পারে না। স্মার্ট ফোন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাড়া মানুষ আজকাল নিজেকে অসহায় বলে মনে করে। তার খুব স্বাভাবিক কারণ হলো মানুষের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তথা সভ্যতা এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপাদানগুলির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। প্রযুক্তি বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার আমাদের জীবনকে কোন ধারায় নিয়ে চলেছে তা বলে শেষ করার মতো নয়।
বিজ্ঞানের দৈনন্দিন প্রভাব: সকালে ঘুম ভাঙ্গানোর অ্যালার্ম, বিছানা ছেড়ে টুথ পেস্ট,গ্যাস জ্বালিয়ে রান্না , অফিস যাওয়ার গাড়ী, কম্পিউটার, ক্যালকুলেটর, মোবাইল, টেলিভিশন, বাস, ট্রেন, এরোপ্লেন সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে রয়েছে বিজ্ঞান। আমাদের জীবনকে সহজ থেকে আরো সহজতর এবং দ্রুত থেকে আরো দ্রুততর করে তোলার পথে বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। বিজ্ঞানহীন হয়ে মানব সভ্যতার অগ্রগতি এমনকি অস্তিত্ব রক্ষা; কোনটাই সম্ভব নয়।
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে সহজ সরল আরামদায়ক করে তুলেছে। অসহ্য গরমে তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, মানুষের সুবিদার্থে বিজ্ঞানীরা ঘুরিয়ে দিয়েছেন নদীর গতিপথ, উষ্ণ মরুকে তা করেছে শস্য শ্যামল। হাড় ভাঙা পরিশ্রমকে বিজ্ঞান অনেক সহজ করে দিয়েছে। আজকের কর্মব্যস্ত মানুষ বিজ্ঞান ছাড়া একপাও এগোতে পারে না।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: সভ্যতার সেই শুরুর দিন থেকেই চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান তার অবদান রেখে চলেছে। আর আজ প্রযুক্তি বিজ্ঞানের দানে চিকিৎসা ব্যবস্থায় চূড়ান্ত উন্নতি সাধিত হয়েছে। স্বভাবতই মানুষের গড় আয়ু আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগের প্রতিকারের জন্য মানুষ আজ ওঝার কাছে না দৌড়িয়ে হাসপাতালমুখী হয়েছে।
প্রতিনিয়ত গভীর গবেষণালব্ধ বিভিন্ন
জীবনদায়ী ওষুধ মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম অক্সিজেন,
ভেন্টিলেটরের মতো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আপৎকালীন মুহূর্তে মানুষের জীবন বাঁচিয়ে
চলেছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলস্বরুপ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভ্যাকসিন নানাবিধ রোগকে পৃথিবী
থেকে নির্মূল করতে সাহায্য করেছে। সর্বোপরি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যাপক
ব্যবহার চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অনেক বেশি সহজ এবং যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিজ্ঞান এবং তথ্য প্রযুক্তি: দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের প্রভাব আলোচনায় তথ্যপ্রযুক্তির উল্লেখ থাকবে না, এমনটা হতেই পারে না। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানের সম্ভবত সবচেয়ে যুগান্তকারী দানটি হল তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের প্রতিদিনকার জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। মানুষের সামাজিক, পারিবারিক তথা প্রশাসনিক জীবন সহ সর্বক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
আর এই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানের দুই উল্লেখযোগ্য ফসল: কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থা। জীবনধারণে অভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তথা মননের ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তাছাড়া এই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: মানুষের জীবনে বিজ্ঞানের অবদান বলে শেষ করার মত নয়। পূর্ব উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলি তার অতি সামান্য কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। ওই উদাহরণগুলি বাদ দিয়ে মানুষ আজও খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষিক্ষেত্রে যেমন বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে থাকে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শিল্প ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রয়োগ হয়ে থাকে।
অন্যদিকে শিক্ষাও আজ সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক হয়ে উঠেছে। তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার সম্ভব হয়েছে। অনেক জটিল প্রক্রিয়ার অত্যন্ত সহজ সমাধান মানুষ করে ফেলছে শুধুমাত্র বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে। বিজ্ঞান আজ দূরকে করেছে নিকট, সমগ্র বিশ্বকে বন্দী করেছে হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানের দানে আঙ্গুলের একটিমাত্র ছোঁয়ায় পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের তথ্যও এক নিমেষে ভেসে উঠছে মানুষের চোখের সামনে।
বিজ্ঞান বনাম মানুষ: তবে বিজ্ঞানের প্রভাবে মানুষ আজ যন্ত্রমানবে পরিণত হয়েছে, তাকে অনুসরণ করে যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হয় না বরং যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সময়ের মানুষ চালিত হয়। জীবনকে সহজ ও সুখের করে তোলার জন্য মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা তাকে নতুন নতুন আবিষ্কার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পনেরোই যন্ত্রভিত্তিক জীবন আজ যান্ত্রিক জীবনে পরিণত হয়েছে।
ইলেকট্রনিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে রোবট ও কম্পিউটারের আবিষ্কার মানুষের জীবনধারার পটচিত্রকে আমুল বদলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পরিণত হয়েছে যন্ত্রের আজ্ঞাবহ দাসানুদাসে। এক মুহুর্ত আধুনিক প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া মানুষ আজ অত্যন্ত অসহায়, নিরুপায় বোধ করে।
প্রযুক্তি বিজ্ঞান ও দারিদ্র: প্রযুক্তি বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে সহজ ও সুখের করে তুলেছে এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে এমন সমূহ অগ্রগতি সত্ত্বেও বিজ্ঞান আজও পৃথিবী থেকে অভিশাপরূপি দারিদ্র্যকে নির্মূল করতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান ধনী-দরিদ্র্যের আর্থিক বৈষম্যের ব্যবধানকে বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তুলেছে।
তাছাড়া প্রযুক্তি বিজ্ঞানের নানান অভিনব আবিষ্কার উপভোগ করতে প্রয়োজন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। যেখানে আমাদের দেশের বহু মানুষ দারিদ্র সমস্যায় জর্জরিত সেখানে প্রযুক্তিগত এইসব অভিনব উপাদানের ব্যবহার, বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রযুক্তি বিজ্ঞানের নানান সুবিধা গুলো যেদিন গরীব মানুষদের কাছেও পৌঁছে যাবে সেদিনই আধুনিক বিজ্ঞানের দানে সভ্যতা সার্থক হয়ে উঠবে।
বিজ্ঞানের অপকারিতা: পৃথিবীতে সকল জিনিসেরই খারাপ ভালো উভয় দিকই বর্তমান। যন্ত্রের উপর নির্ভর করতে গিয়ে আজ মানুষ দিনদিন শ্রমবিমুখ হয়ে পড়ছে, ক্রমশ কমে যাচ্ছে মানুষের স্বনির্ভরতা। ফলে শরীরে নানান রোগ এসে বাসা বাঁধছে।
বিজ্ঞান হল বর্তমান মানুষের হাতিয়ার। এই হাতিয়ারকে সৎ অসৎ যেকোনো কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। বিজ্ঞানের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে প্রয়োগ কর্তার উপর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পরমাণু শক্তি যেমন ব্যাপক মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে, তেমনই এক মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে সম্পূর্ণ পৃথিবীর জীবজগৎকে।
বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানো যেমন সম্ভব, তেমনি সেই বিজ্ঞানেরই দানে কেবলমাত্র একটি বোতাম টিপে এক সম্পূর্ণ জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াও সম্ভব। মানুষের লোভ, হিংসা তথা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য দিনদিন বিজ্ঞান নানান খারাপ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রয়োজনের তুলনায় এই প্রচেষ্টা নিতান্তই অপ্রতুল এবং তা সারা পৃথিবী জুড়েই সত্য। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরে সার্বিক প্রচেষ্টা। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র তৈরি কিংবা মহাকাশ গবেষণার হেতু অন্তরীক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণের প্রয়োজন যেমন রয়েছে তেমনই প্রয়োজন রয়েছে মানুষের জীবনকে তৃণমূল স্তর থেকে বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে তোলার।
বুদ্ধিমত্তার ইন্দ্রজাল এই বিজ্ঞান যেদিন ধ্বংসযজ্ঞকে পাশ কাটিয়ে সমগ্র মানবজাতির সার্বিক মানোন্নয়নে নিয়োজিত হবে সেই দিনই মানুষ লাভ করবে তার সভ্যতার পরম সার্থকতা।
--- সমাপ্ত ---
বৃক্ষরোপণ বা সামাজিক বনায়ণ
রচনার সংকেত-
ভূমিকা: আধুনিক নগরজীবনে ক্লান্ত বিধ্বস্ত কবি একদিন ব্যাকুল হয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” এ বিশ্বে সৃষ্টির আদি হল উদ্ভিদ। এই ধরীত্রির সৃষ্টিলগ্নে বিশ্বসংসার পরিপূর্ণ ছিল বৃক্ষরাজি দ্বারা গঠিত সুবিশাল অরণ্যে। কিন্তু কালের বিবর্তনে যখন সমগ্র প্রাণীকূল তথা মানুষের উদ্ভব ঘটে, তখন মানুষ নিজের প্রয়োজন হেতু পৃথিবীর বুক চিরে নির্বিচারে অরণ্যচ্ছেদন করে আপন সভ্যতার জয়যাত্রা অব্যাহত রাখে। সময়ের লহমায় পৃথিবী তথা সমগ্র জীবকুলের নিয়ম বদলাতে থাকে, বিশ্বজুড়ে মানবসভ্যতা সর্বশ্রেষ্ঠ মাত্রা পায়।
তবুও মানুষ এবং উদ্ভিদকুলের মধ্যে একটা সমতা বরাবর বজায় ছিল। কিন্তু মানুষের ভোগের বাসনার কোন অন্ত ছিল না কোনদিন। আদিম সেই নির্মম বাসনাই নবজাগরণ পরবর্তী তথাকথিত আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাবের পর চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।
আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পৃথিবী জুড়ে গড়ে উঠতে থাকে অসংখ্য নতুন নতুন নগর, কলকারখানা বন্দর আরো কত কি। আপন জৈবিক লালসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পরিবেশকে নিজের ইচ্ছে মতন ব্যবহার ও শোষণ অব্যাহত থাকে।
অরণ্য উচ্ছেদ: শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সৃষ্টির আদি ছিল অরণ্য দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রাচীনকালে পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগের প্রায় সমগ্র অংশই ছিল আরণ্যাবৃত। সময় নাটকের নিয়ম অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সেই জনবসতির বিস্তার ও কৃষি জমি প্রসারের উদ্দেশ্যে বনভূমির বুক থেকে বৃক্ষ ছেদনের নির্মম খেলায় কোমর বেঁধে কুঠার ধরলো মানুষ।
হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত বনভূমি এই ভাবেই শেষ হতে থাকলো। এইখানেই অরণ্য ধ্বংসের শুরু। তারপর সময় যত এগিয়েছে মানুষ নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সভ্যতার প্রসারের আকাঙ্ক্ষায় গড়ে তুলতে শুরু করেছিল নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা বন্দর। এরপর এসেছে আধুনিক নগর সভ্যতার যুগ।
এই যুগে মানুষ হয়ে উঠেছে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, মূল্যবোধহীন ভোগসর্বস্ব জীব। পরিবেশের ভারসাম্য কে সামান্যতম রেয়াত না করেই চলেছে অরণ্যধ্বংস। যার আধুনিকতম উদাহরণ দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত অবহেলা, সেখানকার বিধ্বংসী দাবানল এবং প্রায় মনুষ্যসৃষ্ট ভয়ঙ্কর এক বিপর্যয়।
মোট বনভূমি বা অরণ্যের প্রায় অর্ধেক অংশ এভাবেই নির্বিচারে শেষ করে ফেলেছে মানুষ।শেষ পর্যন্ত যে অরণ্য পরিত্রাণ পেয়ে নিজের অস্তিত্বকে এখনো অব্দি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে, তার পরিমাণ হল পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা মাত্র ৩০ ভাগ।
বৃক্ষরোপণ তথা বনমহোৎসব: গাছ আমাদের একমাত্র অকৃত্রিম বন্ধু। গাছপালা বাদ দিয়ে পৃথিবীতে অন্য কোনো জীবের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায়না। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রত্যেকটি জীব প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। আর বাস্তুতন্ত্রের অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রানীই উদ্ভিদের সাথে জৈবিক আদান প্রদানের মাধ্যমে জীবন নির্বাহ করে থাকে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই একমাত্র অকৃত্রিম বন্ধুটির প্রতি মানুষের চূড়ান্ত এক অবহেলার রূপ লক্ষ্য করা যায়। সেজন্যই হয়তো সমগ্র পরিবেশ আজ সংকটের সম্মুখীন। একথা সত্য যে মানব সভ্যতার অগ্রগতি হেতু পরিমিত বৃক্ষছেদনের প্রয়োজন আছে, তবে সেই স্থানে নতুন বৃক্ষরোপনের প্রয়োজনীয়তাও সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
কিন্তু চারা গাছ লাগানো নয়, শুধুমাত্র গাছ কাটার প্রতিই মানুষের মনোযোগ বেশি লক্ষ্য করা যায়। তাই নতুন গাছ লাগানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।আমাদের এই আধুনিক যন্ত্র পরিচালিত জীবনে বৃক্ষরোপনের প্রয়োজন একান্ত আমাদের নিজেদেরই স্বার্থে। স্বাভাবিকভাবে এইযে বৃক্ষরোপনের উদ্যোগে মানুষের এত অবহেলা, তারই বিশেষ কার্যক্রম বনমহোৎসব নামে পরিচিত।
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে আশ্রমবাসীদের সঙ্গে নিয়ে বর্ষার দিনে বনমহোৎসব পালন করতেন। যদিও বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বৃক্ষরোপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে।
তাই উক্ত বনোমহোৎসব আজ বিশ্বায়িত হয়ে এক আন্তর্জাতিক উৎসবের আকার ধারণ করেছে। আজকাল সরকারি ও বহু বেসরকারি উদ্যোগে তথা বনমহোৎসব পালন করা হয়ে থাকে।
বৃক্ষরোপণ অভিযান: বনজ সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর সম্প্রসারণের জন্য দেশে বিদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রত্যেক বছর বৃক্ষরোপণ অভিযান দুএক সপ্তাহ জুড়ে বা মাসব্যাপী চলে। এসময় বিনামূল্যে সাধারণ মানুষকে চারা গাছ দেওয়া হয় রোপন করবার জন্যে।
এছাড়াও প্রচার করা হয় বৃক্ষরোপনের প্রয়োজনীয়তা, গাছ লাগানো ও সংরক্ষণের সঠিক উপায়। নিঃসন্দেহে বলা যায় বৃক্ষরোপণ অভিযান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যোগ গুলির মধ্যে একটি।
অরণ্যের আচ্ছাদনকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। তাই বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করার জন্য শুধুমাত্র সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাগুলির উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এসমস্ত উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ হয় ঠিকই, কিন্তু তা প্রতিনিয়ত হয়ে চলা বিশ্বব্যাপী অরণ্যছেদনের তুলনায় নিতান্তই সামান্য।
এই ধরনের সংগঠিত উদ্যোগ মানুষকে
নিয়মের গণ্ডিতে নিশ্চয়ই বেঁধে দিতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তা কতখানি
স্বতঃস্ফূর্ত প্রভাব ফেলে সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর পরিবেশের বিষয়ে একমাত্র
সার্বিক স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগই সাফল্যের চাবিকাঠি হতে পারে। সেজন্য বৃক্ষরোপণের বিষয়ে
সার্বিক সচেতনতা এবং সাধারণ উদ্যোগ গড়ে তোলার বিকল্প কিছু হতে পারে না।
বনসংরক্ষণ: বনসংরক্ষণ ব্যতীত বৃক্ষরোপণ একবারেই অর্থহীন। গাছ লাগানোর সাথে সাথে বনভূমিতে যেসব গাছ রয়েছে তাদের বাঁচিয়ে রাখাটাও মানুষেরই দায়িত্বের অঙ্গ। পৃথিবীকে দূষণমুক্ত সবুজ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে শুধু গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয় ,এর জন্য প্রথমে অনিয়ন্ত্রিত অরণ্যধ্বংস বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়াও, নতুন যে সমস্ত বৃক্ষচারা রোপন করা হচ্ছে সেইগুলি যাতে নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে সেদিকেও সচেতন নজর দেওয়া দরকার।
ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছি, আজও মানুষের ভোগ ও লোভের বাসনায় লাগাম টানা যায়নি। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে বহু মূল্যবান গাছ কেটে ফেলছে। এইসব অসাধু ব্যবসায়ীদের যত শীঘ্র সম্ভব সুসংগঠিত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তদুপরি কোনো বিশেষ প্রয়োজনে একটি
গাছ উচ্ছেদ করলে তার বদলে অন্তত দশটি চারা গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রেও
শুধুমাত্র সরকারি বা বেসরকারি সংগঠিত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্বতঃস্ফূর্ত সার্বিক উদ্যোগ
সচেতনতাই বন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সাফল্য এনে দেবে এবং বৃক্ষরোপণের প্রকৃত উদ্দেশ্যও
সিদ্ধ হবে।
অরণ্য ধ্বংসের প্রভাব এবং প্রতিকার: শোষণের হতাশায় পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাসে স্বাভাবিকভাবেই জল স্থল সমগ্র আবহাওয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দূষণের বীজাণু। জলবায়ু হয়ে ওঠে বিষাক্ত। দূষিত এই পরিবেশেই মানুষ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে কাজের সন্ধানে,আশ্রয়ের আশায়, প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে _এ যেন অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতা, কে কার আগে পৌঁছাবে তারই কলরব। আর অন্যদিকে এই ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে দূষিত পরিবেশে নিজের মধ্যেই নিজের মৃত্যুবীজ মানুষ বুনে দিয়ে যাচ্ছে অচিরেই।
এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন দূষণমুক্ত পরিবেশ, সবুজ প্রান্তর, বনরাজির স্নিগ্ধ আচ্ছাদন। একথা আজ পৃথিবীর যেকোন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষই অনুধাবন করতে পারেন খুব সহজেই।
দূষণ প্রতিকার করতে ও সুন্দর শ্যামল পরিবেশ গড়ে তুলতে বনসংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সেজন্যেই আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের এত গুরুত্ব, এত আলোচনা, এত সম্মান।
বন সংরক্ষণ তথা বনসৃজন এর উদ্দেশ্যে
দায়িত্বপ্রাপ্ত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অবশ্যপালনীয় কিছু কর্তব্য:
অরন্যের পুনরুদ্ধার: আমাদের অঙ্গীকার: বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের এই মহাযজ্ঞে যদি আমরা সফল হই তাহলে হয়তো আবার কোন দিন বীজাণু মুক্ত স্নিগ্ধ বাতাসে আমাদের কোন এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শ্বাস নিতে পারবে। হয়তো আমরা সত্যিই এ পৃথিবীর জীবকুলকে এক অমোঘ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো।
আবারো এ পৃথিবীর প্রাণী ও উদ্ভিদকূল
প্রকৃতির নিয়মে পারস্পারিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরম শান্তিতে নিজেদের জীবন অতিবাহিত
করতে পারবে। তাই আজ পরিবেশের এই সংকট কালে দূর ভবিষ্যতের সোনালী স্বপ্নকে চোখে রেখে
সমগ্র মানবজাতির অঙ্গীকার হোক পরিবেশ রক্ষা।কবির ভাষায়-
“চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে
প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
উপসংহার: আধুনিক যন্ত্র পরিচালিত জীবনের কলুষিত পরিবেশ মানুষকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় আরণ্যক সভ্যতার উদার প্রশান্ত জীবনের কথা। কিন্তু এই আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক নগরজীবন ত্যাগ করে অরণ্যের যুগে ফিরে যাওয়ার চিন্তা মানুষের পক্ষে নিতান্তই এক আকাশ কুসুম কল্পনা। পাশাপাশি একথাও সত্য যে পরিমিত অরণ্য ব্যতীত প্রাণীকুলের অস্তিত্ব রক্ষাও কোনভাবে সম্ভব নয়। সভ্যতার অগ্রগতির বীজাণু যখন সেই সভ্যতারই গলা টিপে ধরতে চাইছে, তখন একমাত্র মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুই পারে বিশ্ব সংসারকে এই চূড়ান্ত সংকটের হাত থেকে রক্ষা করতে। সেজন্য নিজের স্বার্থেই, মানবকূলকে আজ শামিল হতে হবে পৃথিবীর ফুসফুস কে পুনরায় সুস্থ করে তোলবার উদ্যোগে।
--- সমাপ্ত ---