চলমান কথা

গত ১১ মে, ২০২০ আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অনলাইন পরীক্ষার শুভ উদ্বোধন করেন প্রকৌশলী এ এম এম সাজ্জাদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপিএসসিএল।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু; স্বপ্ন হলো সত্যি। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সাথে স্বপ্ন যাবে বাড়ি।

Thursday, July 30, 2020

প্রকৃত জ্ঞানের স্পৃহা না থাকলে শিক্ষা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তখন পরীক্ষায় পাসটাই বড় হয় এবং পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় জ্ঞান সীমাবৃদ্ধ থাকে। এই কারণেই পরীক্ষায় পাস করা লোকের অভাব নেই আমাদের দেশে, কিন্তু অভাব আছে জ্ঞানীর। যেখানেই পরীক্ষা-পাসের মোহ তরুণ ছাত্রছাত্রীদের উৎকণ্ঠিত রাখে, সেখানেই জ্ঞান নির্বাসিত জীবনযাপন করে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে জগতের বুকে অক্ষয় আসন লাভ করতে হলে জ্ঞানের প্রতি তরুণসমাজকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সহজ লাভ আপাতত সুখের হলেও জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচিত হবে না।

সারাংশ: শিক্ষায় জ্ঞানের আগ্রহ না থাকলে সেই শিক্ষা ব্যর্থ হয়। কেবল পরীক্ষা পাস নয়, জ্ঞানার্জনই শিক্ষার লক্ষ্য। জ্ঞানচর্চার মধ্যে স্বাধীন জাতির মর্যাদা নিহত। কাজেই পরীক্ষা পাসের সহজ লাভ থেকে দৃষ্টি পরিবর্তন করে জ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।


অতীতকে ভুলে যাও। অতীতের দুশ্চিন্তার ভার অতীতকেই নিতে হবে। অতীতের কথা ভেবে ভেবে অনেক বোকাই মরেছে। আগামীকালের বোঝার সঙ্গে মিলে আজকের বোঝা সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যৎকেও অতীতের মতো দৃঢ়ভাবে দূরে সরিয়ে দাও। আজই তো ভবিষ্যৎ-কাল বলে কিছু নেই। মানুষের মুক্তির দিন তো আজই। ভবিষ্যতের কথা যে ভাবতে বসে সে ভোগে শক্তিহীনতায়, মানসিক দুশ্চিন্তায় ও স্নায়ুবিক দুর্বলতায়। অতএব অতীতের এবং ভবিষ্যতের দরজায় আগল লাগাও, আর শুরু করো দৈনিক জীবন নিয়ে বাঁচতে।

সারাংশ: মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো বর্তমান। অতীত এবং ভবিষ্যতের ভাবনা মানুষের জীবনে কোনো সুফল বয়ে আনে না। বরং তা মানুষকে শক্তিহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং স্নায়ুবিকভাবে দুর্বল করে তোলে। তাই জীবনকে সফল করে তুলতে হলে অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বর্তমানকে গুরুত্ব দিতে হবে।


    মুখে অনেকেই টাকা তুচ্ছ, অর্থ অনর্থের মূল বলিয়া থাকেন। কিন্তু জগৎ এমন ভয়ানক স্থান যে টাকা না থাকিলে তাহার স্থান কোথাও নাই। সমাজে নাই, স্বজাতির নিকট নাই, ভ্রাতা-ভগিনীর নিকটে নাই, স্ত্রীর নিকটে নাই। স্ত্রীর ন্যায় ভালোবাসে এমন বলতে জগতে আর কে আছে? টাকা না থাকিলে অমন অকৃত্রিম ভালোবাসারও আশা নাই। কাহারও নিকট সম্মান নাই। টাকা না থাকিলে রাজায় চিনে না, সাধারণে মান্য করে না, বিপদে জ্ঞান থাকে না। জন্মমাত্র টাকা, জীবনে টাকা, জীবনান্তে টাকা, জগতে টাকারই খেলা।

সারাংশ: অর্থকে অনর্থের মূল বলা হলেও মূলত এটি অত্যন্ত মূল্যবান। অর্থ বিত্তহীন মানুষকে তার পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্রই অসম্মানের চোখে দেখা হয়। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই অর্থই প্রধান অবলম্বন।

 

কিসে হয় মর্যাদা ? দামি কাপড়, গাড়ি, ঘোড়া ও ঠাকুরদাদার কালের উপাধিতে? - মর্যাদা এইসব জিনিসে নাই। আমি দেখতে চাই তোমার ভিতর, তোমার মাথা দিয়ে কুসুমের গন্ধ বেরোয় কিনা। তোমায় দেখলে দাসদাসী দৌড়ে আসে। প্রজারা তোমায় দেখে সন্ত্রস্ত হয়, তুমি মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাওয়া খাও, মানুষকে দিয়ে জুতা খোলাও, তুমি দিনের আলোতে মানুষের টাকা আত্মসাৎ কর। বা-মা-শ্বশুর-শাশুড়ি তোমায় আদর করেন। আমি তোমায় অবজ্ঞায় বলব- যাও।

সারাংশ: সমাজে মানুষের মর্যাদা অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, আভিজাত্য ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয় না। মিথ্যা আভিজাত্য, অহমিকা, অর্থলোভ, দুশ্চরিত্র ইত্যাদি মানুষকে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করে।


Wednesday, July 29, 2020

বাংলাদেশের লোকশিল্প

আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশে লোকশিল্পের চর্চা চলে আসছে| গ্রামীণ জীবনে সাধারণ মানুষ দেশীয় কাচাঁমাল ব্যবহার করে সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে শিল্পসম্মতভাবে যেসব সামগ্রী তৈরি করে সেগুলোকে বলা হয় লোকশিল্প| এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কুলা, ডালা, মোড়া, †cv‡jv, ধামা, খালুই, টোপা ইত্যাদি| বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব জিনিস গ্রামের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হয়| এগুলো নানা ডিজাইনে বিভিন্ন রং ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দনভাবে তৈরি হলেই লোকশিল্প হয়ে যায়| বেত দিয়ে তৈরি শীতলপাটি, মোড়া, চেয়ার, টেবিল, খাট ইত্যাদি শহুরে মানুষের দৃষ্টি কাড়ে| এছাড়া নকশিকাঁথা, মাটি দিয়ে তৈরি নানা তৈজসপত্র, পুতুল, ঘোড়া, হাতি, চুড়ি, দুল, ফুলদানী ইত্যাদি খুবই আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি হয়| এছাড়া শামুক ঝিনুকের তৈরি মালা, কানের দুল, বালা, চাবির রিং ইত্যাদি খুবই আকর্ষণীয়| এসব সামগ্রী বিদেশীদের মন কেড়েছে| এসব রপ্তানি করে আসছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা| এর বাইরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁতে তৈরি শাড়ি, চাদর, জামা বা প্যান্টের কাপড়, লুঙ্গি ইত্যাদির কদর রয়েছে| টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, কুমিল্লার খাদি বা খদ্দর, নারায়ণগঞ্জের জামদানী গেঞ্জি ইত্যাদির কদর রয়েছে| টাঙ্গাইলের তাতেঁরশাড়ি, কুমিল্লার খাদি বা খদ্দর, নারায়ণগঞ্জের জামদানি বা গেঞ্জি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের তৈরি ওড়না, থামি ইত্যাদির খ্যাতি বাংলাদেশের বাইরেও ব্যাপকভাবে রয়েছে| এগুলোর ডিজাইন রং শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, ব্যবহারেও আরাম দায়ক| এসব লোকশিল্প সামগ্রীর খ্যাতি বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে মহীয়ান করে তুলছে|

নবান্ন উৎসব

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিসংশ্লিষ্ট অনেক উৎসব রয়েছে। নবান্ন উৎসব এর মধ্যে অন্যতম।বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণই কৃষিজীবী। কঠিন মাটিকে তারা তাদের শ্রম ও শক্তির দ্বারা নমনীয় করে সেখানে প্রাণের জোয়ার সৃষ্টি করে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অসম্ভব খাটুনির পর ক্ষেতের সোনালি ফসল যখন তারা ঘরে তুলতে পারে তখন তাদের প্রাণে ও আনন্দের বান বয়ে যায়। নবান্ন উৎসব এই আনন্দমুখর প্রাণেরই উৎসব। হেমন্তের শুরু থেকেই সারা বাংলার ঘরে ঘরে ফসল তোলার ধুম পড়ে যায়। তখন এই লোকউৎসব গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে পালিত হয়। উৎসবের দিন ভোর না হতেই ছেলে-মেয়েরা ঘরের বাইরে এসে ছড়া কেটে দাড়ঁকাকদের নিমন্ত্রণ করত। এদিন ভোরে নতুন ধানের নতুন চাল ঢেঁকিতে কোটা হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ির প্রবীণরা পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং ছোট ছেলে-মেয়েরা নতুন জামা-কাপড় পরে। এর পর বাড়ির উঠোনে গর্ত করে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোঁতা হয়। একে বলে ‘বীরবাঁশ’। বীর বাঁশের প্রতিটি কঞ্চিতে নতুন ধানের ছড়া বাধাঁ হয়। বীর বাঁশ পোঁতার পর একটি কলার খোলে চাল মাখা কলা ও নারকেলের নাড়ু কাককে খেতে দেওয়া হয়। কাককে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত এ পর্বটির নাম ‘কাকবলি’। এ অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আহার করে না। শস্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীকে পূজা এবং নবান্ন দিয়ে পরে সকলে আহার করে। ক্রমান্বয়ে এই লোকউৎসবটি সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমান সময়ে নবান্ন উৎসবের ব্যাপকতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। আমাদের উচিত বাংলা ও বাঙালির এই লোক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা।

 অর্থ সম্পদের বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞান সম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না।

মানুষ যখন থেকেই সভ্যতা নির্মাণ করার শুরু করেছে তখন থেকে অর্থের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমান সভ্যতার মাপকাঠিতে অর্থ একটি বড় ব্যাপার। অর্থ দিয়েই মূলত আমরা সমাজে মানুষের অবস্থান এবং গ্রহণযোগ্যতা পরিমাপ করে থাকি। বিত্তবান হিসেবে সমাজে পরিচিত হওয়াটাও অনেকের কাছে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু এই বিত্ত-বৈভব, ধন-সম্পদ যেকোনো মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে। আমীর পরিণত হতে পারে ফকিরে।

কিন্তু জ্ঞান এমন এক সম্পদ যা কোনদিন বিনষ্ট হয় না। একজন জ্ঞানী চিরদিনের জন্য জ্ঞানী। কিন্তু একজন ধনী চিরদিন ধনী নাও থাকতে পারে। অর্জিত সম্পদ যেকোনো সময় হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। অর্জিত জ্ঞান কখনোই হারানোর ভয় থাকে না। ধনী ব্যক্তি তার সম্পদ দান করে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু জ্ঞানীর বিতরণ করা জ্ঞান অন্যদেরকেও জ্ঞানীর কাতারে সামিল করে অনিঃশেষ থেকে যায়।

জ্ঞান মানুষকে অমরত্ব দান করে, সম্পদ তা পারে না। সক্রেটিস, প্লেটো, নিউটনরা বহু শতাব্দি আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাদের জ্ঞান সভ্যতাকে এখনো পথ দেখাচ্ছে। জ্ঞানের শাশ্বত এ সত্য সবারই জানা, সম্পদের বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞান সম্পদের বিনাশ নেই। মানুষের গড়া বহু সভ্যতা বহু ধন সম্পদ সময়ের সাথে সাথে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ যে জ্ঞান পৃথিবীতে রেখে গেছে তা ক্রমশ নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু জ্ঞানের কারণেই মানুষ সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

শিক্ষা: জ্ঞান আহরণ এবং জ্ঞান বিতরণ সভ্যতাকে গুহার অন্ধকার থেকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। সুতরাং জ্ঞান কখনোই বিনষ্ট হতে পারে না। অর্থ সম্পদ মানুষকে সাময়িক তৃপ্তি দিলেও জ্ঞানের সমকক্ষ হতে পারে না।

      পরের অনিষ্ট চিন্তা করে যেই জন নিজের অনিষ্ট বীজ করে সে বপন।

মানুষ একা বাস করতে পারে না। তাকে সমাজের মধ্যে বাস করতে হয়। সমাজে প্রতিটি মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস করে। মানুষের অন্যতম মানবিক এবং নৈতিক গুণ হচ্ছে একে অপরের কল্যাণসাধন করা। মানুষ শুধু নিজের কথা চিন্তা করে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে না। মানুষকে তার চারপাশের জগৎ নিয়েও ভাবতে হয়।

যে ব্যক্তি সর্বদা অন্যের কল্যাণ এবং উপকারের কথা চিন্তা করে, সেই ব্যক্তি সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হন। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে কেউ যখন নিজের ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তখন সে অন্যের ক্ষতি করতেও পিছপা হয় না।

অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা চরম অন্যায় হিসেবে বিবেচিত। অন্যায়কারীরা নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে সমাজ, দেশ এবং জাতির চরম ক্ষতিসাধন করে। এরা সমাজের মানুষের নিকট ঘৃণ্য ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়। অন্যায়কারীরা সব সময় হীনমন্যতায় ভোগে। তাই তাদের মন-মানসিকতায় শুদ্ধি আসে না। ফলে তারা তাদের কর্মক্ষেত্র তথা জীবনে উন্নতি করতে পারে না। পরের অনিষ্টকারী ব্যক্তিরা অপরের জন্য পাতা ফাঁদে নিজেরাই পতিত হয়। নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে মহাবিপদ ডেকে আনে।

শিক্ষা: প্রত্যেক মানুষেরই উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরের মঙ্গল কামনা করা, অপরের মঙ্গল করার চেষ্টা করা। তবেই নিজের কল্যাণ সাধিত হবে।


ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ।

প্রাণীকূলের মধ্যে সবচেয়ে পরিশ্রমী প্রাণী ধরা হয় পিপড়া এবং মৌমাছিকে। শুধু কর্মই যদি শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হত তবে মানুষের আগে শ্রেষ্ঠত্ব পেত পিপড়া এবং মৌমাছি। মানুষকে অন্য সকল প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠ করেছে তার জ্ঞান, বিবেক, বুদ্ধি এবং চিন্তা করার ক্ষমতা। পরিশ্রমের পাশাপাশি এই তিনের সমন্বয় প্রতিটি মানুষকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে। মানুষ মাত্রই ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করবে। প্রতিটা মানুষের বর্তমান জুড়ে থাকে তার ভবিষ্যতের ভাবনা।

কাজেই ভবিষ্যতই হল মানব জাতির একমাত্র চিন্তার স্থল। ভবিষ্যতের কর্ম-পরিকল্পনাই ঠিক করে দেয় জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে কারা বসবে। কে নেতৃত্ব দেবে আগামীর পৃথিবীকে। ক্ষুদ্র পিপীলিকা আর মৌমাছি যদি আগত শীতের জন্য সারা বছর খাদ্য সঞ্চয় করে ভবিষ্যতকে নিরাপদ করতে পারে; তবে মানুষ হিসেবে আমাদেরও উচিত ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবা। সাধারণ মানুষ আর জ্ঞানীজনদের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় কর্ম পরিকল্পনা। আজকের পৃথিবী উন্নত বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্বে বিভক্ত শুধু ভবিষ্যতের কর্মপন্থা আর তার বাস্তবায়নের জন্য।

প্রকৃত জ্ঞানী যারা তারাই ঠিক করে রাখে আগামী দিন কি করবে। ভবিষ্যতের ভাবনায় যাদের বর্তমান কাটে তারাই প্রকৃত জ্ঞানী। কারণ, বলা হয়ে থাকে “একটি ভাল পরিকল্পনা কর্ম সম্পাদনের অর্ধেক পথ অতিক্রম করে।” কাজেই ভবিষ্যৎ নিযে যে যত ভাবে তার উন্নতি তত বেশি বেগবান হয়।

শিক্ষা: মানুষ অতীত থেকে শুধু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে। জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতকে সাজানোর কোন বিকল্প নেই। আর তাই ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই সকল উন্নয়নশীল জাতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার।
     গ্রন্থগত বিদ্যা আর পর হস্তে ধন নহে বিদ্যা, নহে ধন হলে প্রয়োজন।

মানুষের জ্ঞানের ধারক ও বাহক হচ্ছে গ্রন্থ। গ্রন্থ পাঠ করে মানুষ তার জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটায়। নিজের ও অন্যের প্রয়োজনে সেই বিদ্যাকে কাজে লাগায়। বিদ্যার আলোকে জগৎকে উদ্ভাসিত করে। শাশ্বত সত্য-সুন্দরের পথ নির্দেশ করে। কিন্তু বিদ্যা যদি কেবল গ্রন্থগতই হয় তবে তা কোনো কাজেই লাগে না।

গ্রন্থগত বা পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে যথার্থ জ্ঞানী করে তুলতে পারে না। বিদ্যাকে জীবনের উপযোগী করে তোলার মধ্যেই এর যথার্থ উদ্দেশ্য নিহিত। কাজেই তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারিক জ্ঞানও থাকা দরকার। বিদ্যা অর্জন করে তাকে কাজে লাগাতে হবে। কেবল মুখস্থ করে লেখাপড়া করলে তা প্রয়োজন মতো ব্যবহার করা যায় না।

যে জ্ঞান ব্যবহারিক জীবনে কোনো কাজে আসে না সে জ্ঞান দ্বারা নিজেরও যেমন কোনো উপকার হয় না তেমনি জগতেরও কোনো কল্যাণসাধন হয় না। আর যে বিদ্যা প্রয়োজনের সময় কাজে ব্যবহার করা যায় না প্রকৃতপক্ষে সে বিদ্যার কোনো মূল্য নেই। তেমনি মানুষের জীবনে ধন-সম্পদেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ধন-সম্পদ অর্জনের জন্য প্রয়োজন হয় কঠোর পরিশ্রম।

পরের ধন-সম্পদকে নিজের মনে করা কিংবা নিজের ধন-সম্পদ অন্যের কাছে জমা রেখে নিজের বলে হিসাব করা চরম বোকামি। কারণ অন্যের নিকট জমা রাখা ধনসম্পত্তি প্রয়োজনের সময় কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। সুতরাং সার্থক ও সুন্দর জীবনের জন্যে বিদ্যাকে যেমন আত্মস্থ করতে হবে, ঠিক তেমনি ধন-সম্পদ অন্যের কাছে অহেতুক গচ্ছিত না রেখে নিজের আয়ত্তে রাখতে হবে। যাতে বৃহত্তর মানবকল্যাণে তা কাজে লাগানো যায় তথা দেশ ও দশের মঙ্গলে ব্যবহার করা যায়।

শিক্ষা: গ্রন্থগত বিদ্যা আর অন্যের আয়ত্বে থাকা ধন কোনো প্রয়োজনে আসে না। মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হওয়ার মধ্য দিয়েই এসবের সার্থকতা।

আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনি পরে। 
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

পৃথিবীতে কোনো মানুষই চিরস্থায়ী নয়। মানুষ কেবল চিরস্থায়ী থাকতে পারে তার মহৎ কর্মের মাধ্যমে। কর্মই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে দীর্ঘ সময়। মানুষের যথার্থ পরিচয় নিহিত কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার মাধ্যমে। যারা শুধু নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পায় না।

জীবনে কেউ যদি ভালো কাজ না করে তবে সে জীবন অর্থহীন। মানবজীবন শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, সবার সুখ তার মধ্যে জড়িয়ে থাকে। কারণ ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষুদ্র পরিসরে মানবস্বার্থের চিন্তার অবকাশ থাকে না। অন্যের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে কাজ করার মধ্যেই আত্মা প্রকৃত অর্থে সুখী হয়। মানুষ সুখের জন্য দিশেহারা, তারা কাজের মধ্যে সুখ খুঁজে পেতে চায়।

তাই মানুষের প্রতি স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলে। অপরদিকে পৃথিবীতে কম সংখ্যক মানুষ আছে যারা নিজের কথা চিন্তা না করে, অন্যের সুখ-শান্তি তথা কল্যাণের কথা চিন্তা করে। অপরের সুখ-শান্তির মাঝে নিজের পরম সুখের ঠিকানা খুঁজে পায়। যেমন- মাদার তেরেসা মেসোডেনিয়া ছেড়ে কলকাতায় এসে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জেলে কাটিয়েছেন জীবনের ২৭টি বছর, তাছাড়া মার্টিন লুথার কিং, মহাত্মাগান্ধী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের কল্যাণে। বিশ্বের যা কিছু মহান, মহৎ কর্ম, যা মানব সভ্যতাকে স্বর্ণ শিখরে নিয়ে গেছে তার মূলে রয়েছে মহৎ মানুষের ভূমিকা।

অপরের কল্যাণ সাধনের জন্য তারা তাদের নিজেদের সুখ শান্তি, আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস সবকিছু বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করেননি।

শিক্ষা: সংকীর্ণ স্বার্থপরতায় বিভোর মানুষ কোনো দিন সুখ নামক বস্তুটির দেখা পায় না। তাই মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াই প্রকৃত মানুষের কাজ।

   সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা আশা তার একমাত্র ভেলা।

প্রতিনিয়ত মানুষ পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজাতে চায়। চায় মায়া মমতার বন্ধনে আবদ্ধ সুখের সংসার। কিন্তু মানবজীবন পুষ্পশয্যা নয়। সংসারে আছে জটিলতা, নানা সমস্যা আর চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব। কখনো দুঃখ এসে তছনছ করে দেয় সুখের সাজানো সংসার। স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নানা প্রতিবন্ধকতা।

জীবনের চরম বিপর্যয়ের দিনগুলোতেও মানুষ আশায় বুক বাঁধে। সংসার সাগরে একদিকে দুঃখ খেলা করে অন্যদিকে সে খেলায় টিকে থাকার জন্য মানুষের অবলম্বন আশা। মানুষ আশাকে ভরসা করেই জীবনতরীর হাল ধরে শক্ত করে। উত্তাল সাগরের বুকে জাহাজ চালানো খুবই কঠিন। তারপরও নাবিক বেঁচে থাকার আশায় তীরে পৌঁছানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে।

তেমনি সংসাররূপ উত্তাল দুঃখের সাগর মানুষ পাড়ি দেয় আশার তরণী ভাসিয়ে। মানুষ রঙিন স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, তাই জীবনকে সামনের দিকে নিয়ে যায় এই আশাতে যে,্আগামী দিনগুলো সুন্দর হবে। কোনো দুঃখ কষ্ট থাকবে না। স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে, ধরা দিবে বাস্তবে এসে। তাই মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হলো আশা। সাফল্যের পথে আশা মানুষকে দেয় প্রেরণা। কেননা, পৃথিবীর সব ছোট-বড় সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে আশা। শত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে যারা আশা নিয়ে পরিশ্রম করে গেছেন তারাই হয়েছেন স্মরণীয়-বরণীয়। কখনো দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে হয়তো দুরাশা এসে মন দখল করতে পারে।

কিন্তু সেটা ক্ষণস্থায়ী। দুরাশার দুঃসময়েও মানুষ নতুন করে আশায় উদ্দীপ্ত হয়। চায় নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে। আশাই মানুষের জীবনীশক্তি। তাইতো বলা হয়- ‘আশায় বসতি।’ আশা ভাগ্যহতকে শোনায় জেগে উঠার গান। আশার ভেলায় ভর করেই চলছে পৃথিবী, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সমাজব্যবস্থা। আশা আছে বলেই শত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিটি মানুষ বাঁচতে শেখে।

শিক্ষা: এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষকে নানা বাধা বিঘ্ন পার হতে হয়, পুড়তে হয় দুঃখের আগুনে। কিন্তু আশা মানুষকে পথ দেখায় কীভাবে দুঃখের আগুনে পুড়ে সুখ লাভ করা যায়, প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়।

      জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। চারপাশের জীব-জগৎ নিয়েই মানুষ জীবনযাপন করে। কেননা, সৃষ্টিকর্তা বহুরকম উপাদান দিয়ে পৃথিবীকে সাজিয়েছেন। প্রত্যেক জীবের সাথে অন্য জীবের কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক রয়েছে। জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী মানুষও সেই সম্পর্ক বা বন্ধনে আবদ্ধ। যে সৃষ্টিকর্তা তাকে এই সুন্দর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন মানুষের কর্তব্য তাঁর উপাসনা করা, তাঁকে খুশি করা। মানুষ তাঁকে খুশি করতে পারে উপাসনালয়ে প্রার্থনা করার মাধ্যমে এবং তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবেসে সেবা করে।

স্রষ্টার সৃষ্টিকে না ভালোবেসে, মসজিদ-মন্দিরে গিয়ে যদি আমরা সারা দিন রাত তাঁকে ডাকি তিনি খুশি হবেন না। কেননা, সৃষ্টিকর্তা সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন পরম ভালোবেসে। ক্ষুদ্র থেকে বিশাল সবকিছুর প্রতিই তাঁর দৃষ্টি রয়েছে। আর সব কিছু তিনিই লালন-পালন করছেন। তাই তাঁর সৃষ্টির সেবার মাঝেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। সৃষ্টির বৈচিত্র্যতার মাঝেই রয়েছে স্রষ্টার বিশালত্ব। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে, সংসার ত্যাগী হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে তাঁকে খুঁজলে পাওয়া যায় না। আমাদের সমাজে যারা ঐশ্বর্যশালী মানুষ তাদের উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

এতে অসহায় মানুষগুলো খুশি হবে। মানুষের এই খুশিই সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করবে। সমাজ হবে সুন্দর। শুধু মানুষ নয়, পশু পাখিকেও ভালোবাসতে হবে। তাকে পেতে হলে জীবে দয়া করতে হবে। তাইতো সব ধর্মের মূল কথা জীবে দয়া করা। স্রষ্টার সৃষ্টি যে কত মূল্যবান তা আমরা বৌদ্ধ ধর্মের ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ এই বাণী থেকে বুঝতে পারি। হযরত মুহাম্মদ (স.) সব সময় জীবের সেবা করতেন এবং মানুষকে সবসময় জীবের প্রতি সদয় হতে উৎসাহিত করেতেন। সর্বোপরি সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টার বহিঃপ্রকাশ। তাই ঈশ্বরকে সেবা করতে হলে তাঁর সৃষ্টিকেই সেবা করতে হবে।

শিক্ষা: সৃষ্টিবিহীন যেমন স্রষ্টার কথা ভাবা যায় না, ঠিক তেমনি সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে স্রষ্টাকে খোঁজা বৃথা চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

       ধনের মানুষ, মানুষ নয় মনের মানুষই মানুষ।

মানুষ জন্ম থেকেই দুটি পরিধির মধ্যে বাস করে। একটি আত্মপরিধি অন্যটি বিশ্বপরিধি। একদিকে থাকে আত্মসুখ ও ঐশ্বর্য আকাক্সক্ষা অন্যদিকে থাকে ত্যাগ ও মানবকল্যাণের চিন্তা। আত্মপরিধি সম্পন্ন মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। কারণ প্রকৃত মানুষ যারা তারা অপরের হিতকামনা করেন। সহানুভূতি, পরার্থপরতা ও সমষ্টিগত কল্যাণবোধ ছাড়া মনুষ্যত্ব থাকে না।

এ গুণগুলো মানুষকে সুন্দর মনের অধিকারী করে তোলে। পরোপকারী ও ত্যাগী মনের মানুষই প্রকৃত মানুষ। জনসাধারণের কাছে সংকীর্ণ মনসম্পন্ন প্রবল অর্থশালী লোকের কোনো মূল্য নেই। তারা আপাত সম্মান পেলেও হৃদয়ের শ্রদ্ধাবোধ পায় না কখনই। মৃত্যুর সাথে সাথে তার নামও বিলীন হয়ে যায় পৃথিবী থেকে। মৃত্যুর পর মানুষ আর তাকে স্মরণ করে না কখনই।

একমাত্র পরোপকারী মনের অধিকারী বিত্তবান মানুষ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কথায় বলে ‘বিত্তের চেয়ে চিত্ত বড়।’ সুন্দর মনের মানুষ সম্পদহীন হলেও অপরের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পায়। মানুষ তাকে মৃত্যুর পরেও অনন্তকাল মনে রাখে। মৃত্যুর পরও সে মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় হয় সিক্ত।

শিক্ষা: ধন-ঐশ্বর্য নয়, মানবকল্যাণকামী সহানুভূতিশীল মনই মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করতে পারে। এ ধরণের মানুষই প্রকৃত মানুষ।


 স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।

প্রত্যেক মানুষের কাছেই স্বাধীনতা একান্ত কাম্য। কেউ পরাধীন থাকতে চায় না। তবে পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়া অনেক কঠিন। আবার স্বাধীন হওয়ার চেয়ে স্বাধীনতা ধরে রাখা আরো কঠিন। কারণ তখন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি অনেক সোচ্চার থাকে। তাই স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম আরো বড় হয়ে সামনে আসে। শক্তিশালী শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে বহুকষ্টের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলেও নানা কারণে তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায়।

কারণ স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল থাকে। আর তখন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি নানাভাবে এসব দুর্বলতার সুযোগ নিতে চায়। এসময় তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নতুন স্বাধীন হওয়া দেশকে প্রথমে সুগঠিত করতে হয়। দেশের প্রতিটি মানুষকে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, বুদ্ধি দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে অর্থনীতি, শিল্প, কৃষিসহ সকল অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হয়।

ফ্রান্সের বিশিষ্ট সমাজতত্ত্ববিদ রোঁমা রোঁলা বলেছেন- “কোনো দেশ বা জাতিকে শুধু তার সীমান্ত রক্ষা করলেই চলবে না তার শুভ বুদ্ধিকেও রক্ষা করতে হবে। জাতি তার স্বাধীনতা রক্ষা করবে, পাশাপাশি রক্ষা করবে তার চিন্তা ও আত্মার স্বাধীনতা।” স্বাধীনতা অর্জন করতে যেমন সাহসী পদক্ষেপ নিতে হয় তেমনি রক্ষার জন্যও আরো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ও সংগ্রামী হতে হবে। স্বাধীনতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সকলকে সচেতন ও সংঘবদ্ধ হতে হবে।

স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হবে এবং স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্ত বিরোধী শক্তির হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য দায়িত্ব সচেতন ও নিবেদিত প্রাণ দেশপ্রেমিক হতে হবে।

শিক্ষা: স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি জাতিকে বহু কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আবার এই অর্জিত স্বাধীনতাকে ধরে রেখে নিজেদের অবস্থান আরো উন্নত করার জন্য দেশের সকলকে আরো বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।

 জাতীয় জীবনে টেলিভিশনের ভূমিকা

সূচনা: টেলিভিশন বর্তমান বিশ্বে বিনোদনের সর্বাধিক জনপ্রিয় মাধ্যম। ‘টেলি’ শব্দটি ল্যাটিন ‘tele’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দূরবর্তী আর ‘Vision’ শব্দ ‘Visio’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ দেখা। টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা ঘরে বসে দূরবর্তী স্থানে প্রচারিত কোনো অনুষ্ঠানের দৃশ্য ও শব্দ একই সঙ্গে দেখতে এবং শুনতে পাই।

আবিষ্কার: বিজ্ঞানীদের বহু বছরের সাধনা ও গবেষণার পথ ধরে ১৯২৫ সালে ইংল্যান্ডের বৈজ্ঞানিক বেয়ার্ড টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৪৫ সালে তা বর্তমান রূপ লাভ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে টেলিভিশন এনে দিল অভাবিত উন্নতি। ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে মানুষ সারাবিশ্বকে জেনে নিতে পারছে আজ।

জনমনে টেলিভিশনের প্রভাব: জনমনে টেলিভিশনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কি আনন্দ, কি শিক্ষা, কি জ্ঞান, উপদেশ, সতর্কবাণী- যেকোনো বিষয়ে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান লক্ষ লক্ষ দর্শক হৃদয়ে একই সঙ্গে যেভাবে অনুভূতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় তেমনটি আর কারো পক্ষেই করা সম্ভবপর নয়। সাধারণত টেলিভিশনকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ধরা হলেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, দেশ-বিদেশের খবরা-খবর, দেশের নানা সমস্যার সমাধান, সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়ন বিষয়ক নানা প্রকার আলোচনা, সমালোচনা, প্রতিবেদন ইত্যাদি ভিত্তি করে টেলিভিশনে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। তাই শিক্ষা-দীক্ষা বিস্তার এবং জাতি গঠনে টেলিভিশনের উপযোগিতা আজ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চ-নিম্ন সকল ধরনের পেশাজীবী, ছোট-বড় নির্বিশেষে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে টেলিভিশন একটি আকর্ষণীয় আনন্দের মাধ্যম। তাই জনকল্যাণের এক বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার অন্যতম হাতিয়ার রূপে আজকের দিনে টেলিভিশনের অপরিসমি ভূমিকা রয়েছে।

টেলিভিশন ও বিশ্ব শিল্প: টেলিভিশন দূরকে নিকট করে। সারা বিশ্বকে এনে দেয় চোখের সামনে। হিউস্টনে বসে আমেরিকার মানুষ দেখতে পেয়েছিল চাঁদের বুকে নীল আমস্ট্রং-এর অবতরণ। বাংলাদেশে বসে আমরা দেখতে পাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বড় বড় খেলাসমূহ। দেখতে পেয়েছি জাপানে অনুষ্ঠিত মোঃ আলী ক্লের মুষ্টিযুদ্ধ, ইংল্যান্ডের রাজপুত্র চার্লস-এর বর্ণাঢ্য বিবাহ উৎসব, সুদূর মক্কার কা’বা প্রাঙ্গনের হজ্জ্ব, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আরো হাজারো চমকপ্রদ ঘটনাবলি। টেলিভিশন প্রতিদিনকার পৃথিবীকে তথ্যে সমৃদ্ধ করে আমাদের চোখের সামনে উদ্ঘাটিত করে দিচ্ছে।

শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশে টেলিভিশন: শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে টেলিভিশন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশ জাতীয় উন্নয়নের একটি অপরিহার্য শর্ত। টেলিভিশনে বিভিন্ন প্রকার গান, বাজনা, নাচ, নাটক, আবৃত্তি, কৌতুক প্রচারিত হয়। এতে একদিকে যেমন শিল্পচর্চার অব্যাহত ধারা সৃষ্টি হয় তেমনি জাতীয় জীবনে প্রতিভা বিকাশের পথও প্রশ্বস্ত হয়। টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পী ও উপস্থাপকদের উপস্থাপনা, কথাবর্তা, বাচনভঙ্গি ইত্যাদির শিল্প মাধুর্য জনগণের মধ্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

গণতান্ত্রিক সরকার ও টেলিভিশন: গণতান্ত্রিক সরকার সৃষ্টির একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম টেলিভিশন এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রধান বা দেশের প্রখ্যাত নেতাগণ জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করে দেশ ও সমাজের কল্যাণের লক্ষ্যে গণসচেতনতা ও জনমত সৃষ্টি করতে পারেন। সরকারের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কার্যাবলির প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করে সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র গড়ে তোলা যায়।
টেলিভিশন ও বাংলাদেশ: সমস্যাসংকুল বাংলাদেশে টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সমাজের নানা সমস্যার সমাধানকল্পে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে যথেষ্ট সুফল পাওয়া সম্ভবপর। টেলিভিশন গণশিক্ষার একটি উপযুক্ত মাধ্যম। উন্নত দেশে স্কুল কলেজে শিক্ষাদানের অনুষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তকের আলোচনা, বিজ্ঞান ও গবেষণা বিষয়ক আলোচনা, বিতর্ক অনুষ্ঠান, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ইত্যাদি প্রচার করে শিক্ষা বিস্তারে ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পারে।

কৃষি ও টেলিভিশন: বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। জাতীয় উন্নতির অন্যতম শর্ত কৃষির উন্নতি। এ লক্ষ্যে টেলিভিশনের উন্নত পদ্ধতিতে চাষবাস, সঠিক সময়ে উপযুক্ত শস্যের আবাদ, মৎস্য চাষ, পশুপালন, খামার স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন, আলোচনা ও প্রশিক্ষণমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে বাংলাদেমের কৃষকদের অশেষ উপকার-সাধন করা যায়। এই উপলক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে ক্লাব অথবা সেবা সমিতি প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র কৃষকদের দর্শনের সুবিধার্থে অধিকসংখ্যক টিভি সেট সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতি গঠনে টেলিভিশন: একটি জাতি গঠনে এবং জাতিকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে টিশিভিশনের সমকক্ষ আর কিছু নেই। ক্ষেত-খামার থেকে শুরু করে কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, খেলাধূলা ইত্যাদির সকল বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করে টিলিভিশন জাতির প্রতিটি সদস্যকে কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকে।

জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে টেলিভিশনের গুরুত্ব: বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা, সমাজের নানা প্রকার দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা ইত্যাদি বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আইন আদালত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের চোরাচালানী, কালো-বাজারী, দুর্নীতি, ধূমপান বা মাদকদ্রব্যের মরণনেশা ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৈতিক অধঃপতন রোধে এবং দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে টেলিভিশনের ভূমিকা অসামান্য। বিনোদনের ক্ষেত্রে টেলিভিশন অবশ্যই উন্নত রুচির শিল্প মাধুর্যমন্ডিত অনুষ্ঠান প্রচার করে জনগণকে সুস্থ ও নির্মল আনন্দ-প্রধানের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। টেলিভিশনের মাধ্যমে একটি জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান লাভ করতে পারে।

উপসংহার: উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশগুলোতে টেলিভিশনকে শুধুমাত্র বিনোদনের বিলাসসামগ্রী হিসেবে না দেখে এবং ধনীগৃহে এর ব্যবহার সীমিত না রেখে সরকারি প্রচেষ্টায় তাকে গণমুখী করে তোলা দরকার।