চলমান কথা

গত ১১ মে, ২০২০ আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের অনলাইন পরীক্ষার শুভ উদ্বোধন করেন প্রকৌশলী এ এম এম সাজ্জাদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপিএসসিএল।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু; স্বপ্ন হলো সত্যি। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সাথে স্বপ্ন যাবে বাড়ি।

Wednesday, July 29, 2020

 সময়ের মূল্য

ভূমিকা: অন্তহীন যাত্রাপথে নিরন্তর বয়ে চলেছে সময়। সে চলার বিরতি নেই, নেই পিছুটান। মহাকালের সেই নিরবধি প্রবাহে ক্ষণবন্দী মানুষের জীবন। তাতে প্রত্যেক মানুষের জীবন সময়ের শৃঙ্খলে বাঁধা। সময়ের মহাসমুদ্রে মানুষ মাত্রই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেয়ে যায় তার ছোট্ট জীবনের ভেলা। অনন্ত প্রবাহিত সময়ধারা থেকে যে খণ্ড সময়টুকু মানুষ তার জীবন রচনার জন্যে পায় তা এত দুর্লভ, এত মূল্যবান যে মানুষকে চিরকাল হাহাকার করতে হয়- ‘নাই যে সময়, নাই নাই’। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে হাহাকার করে- ‘জীবন এত ছোট কেন?’ তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জীবনে মহামূল্যবান।

মানবজীবনে সময়ের মূল্য: অনন্ত মহাকালের বুকে মানুষ তার জীবনে পায় সামান্য কিছু দুর্লভ সময়। এ সময়টুকুও অনন্ত বহমানতায় হারিয়ে যায়। কবি হেমচন্দ্রের ভাষায়-

দিন যায় ক্ষণ যায় সময় কাহারো নয়
বেগে ধায়, নাহি রহে স্থির।

তাই জীবনের মূল্যবান প্রতিটি মুহূর্ত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলেই জীবন সফল হয়, সুন্দর হয়, সার্থক হয়, জীবনের মূল্যবান সময় হাতে পেয়েও মানুষ তাকে কাজে লাগায় না। সময়কে অবহেলা করে, আলস্য সময়ের অপচয় করে। সময়কে চোখে দেখা যায় না বলে মানুষ ভুল করে। অলস হয়ে, কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকে বলে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফলে জীবনে তাদের ব্যর্থতার জ্বালা সইতে হয়। কারণ, যে সময় চলে যায় তা আর কখনো ফিরে আসে না। তাই মানুষের জীবনে কর্মের ও সৃজনের সফলতা অনতে হলে সময়ের মূল্য অনুধাবন করা দরকার।

বাঙালির সময়জ্ঞান: দুঃখের বিষয় বাঙালির জীবনে সময়-সচেতনতা খুবই কম। এর মূলে রয়েছে বাঙালির প্রাচীন জীবনযাত্রা থেকে প্রাপ্ত অভ্যাস। দীর্ঘকাল ধরে বাঙালির সমাজজীবনের কাঠামো ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। সেখানে জীবনে জটিলতা ছিল কম। অল্প আয়াসে সোনার ফসলে মাঠ ভরে যেত বলে জীবন সংগ্রামের গতি ছিল মন্থর। প্রচুর অবসর মিলত বলে সেকালে বাঙালির জীবনে ছিল বারো মাসে তের পার্বণের আনন্দ। বাইরের জগৎ কোথায় চলেছে সেদিকে বাঙালি খুব একটা ফিরে তাকায় নি। কিন্তু বাঙালির সুখবিভোর অলস-মন্থরতা ভরা জীবনে প্রবল অভিঘাত লাগে এদেশে ইংরেজ আগমনের পর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে দেখা গেল, পৃথিবী যেমন এগিয়ে গেছে তেমনি তাদের সময়-সচেতনতার তুলনায় বাঙালির সময়-সচেতনতা রয়েছে অনেক পিছিয়ে। এরপর বাঙালির সময়-সচেতন হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু অলস অভ্যাসের জের এখনো চলছে। বাঙালির সময়জ্ঞান সম্পর্কে যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ চলে সে অপবাদ এখনও আমরা মোচন করতে পারি নি।

সময় সচেতনতার গুরুত্ব: জীবনের সার্থকতার জন্যে সময়নিষ্ঠা একটা গরুত্বপূর্ণ শর্ত। Time and tide wait for none- এই সুভাষিতটি মনে রাখলে আমরা বুঝতে পারি আমাদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত কত মূল্যবান। স্বাস্থ্য হারালে তা আবার ফিরে পাওয়া যায়, হারানো সম্পদ হয়তো পুনরুদ্ধার সম্ভব। কিন্তু হারানো, উপেক্ষিত, অপব্যয়িত সময়কে জীবনে কিছুতেই আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো দরকার। সময়নিষ্ঠ ইংরেজদের আরোও একটি সুভাষিত রয়েছে: Time is money. কথাটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সময়জ্ঞান আক্ষরিক অর্থে সবসময় হয়তো অর্থপ্রাপ্তি ঘটায় না। কিছু সময় মানব জীবনে নিঃসন্দেহে মূল্যবান সম্পদ। সময়ের আক্ষরিক সদ্ব্যবহার করে মানুষ অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান, সৃজনকর্ম ইত্যাদি ফুল-ফল-ফসলে জীবনকে ভরিয়ে দিতে পারে। এতে জীবন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ, সার্থক।

ছাত্রজীবন ও সময়নিষ্ঠা: ছাত্রজীবন হচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ ফসল জীবন গঠনের প্রস্তুতিপর্ব। সময়ানুবর্তিতার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর অভ্যাগ গড়ে তোলার প্রকৃষ্ট সময় ছাত্রজীবন। ছাত্রজীবনে লেখাপড়া, খেলাধুলা, বিনোদন ও বিশ্রামের জন্যে সুষ্ঠু সময়- পরিকল্পনা করা দরকার। শ্রমকুণ্ঠ, সময়-অসচেতন, আলস্যপ্রিয় ছাত্র কেবল যে লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায় তা নয়, বৃহত্তর জীবনের পদে পদে তাকে ফেলতে হয় ব্যর্থতার দীর্ঘস্বাস। তাই অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি সময়নিষ্ঠ হওয়ার শিক্ষাও ছাত্রজীবনে অর্জন করতে হয়। এ সময় সময়ানুবর্তিতা অভ্যাসে পরিণত হলে তার ভবিষ্যৎজীবনেও তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে।

মনীষীদের জীবনে সময়নিষ্ঠার তাৎপর্য: মানব-ইতিহাসে যাঁরা বরণীয় স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের জীবন সময়-সচেতনতার তাৎপর্যে ভাস্বর। খণ্ডকালের জীবনে সময়ের শাসনকে স্বীকার করে নিয়েই তাঁরা জীবনকে দিয়েছেন পূর্ণতা, কালের বাঁধনকে অতিক্রম করে অর্জন করেছেন কালান্তরের অমরত্ব। বিশ্ববনেণ্য কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা সীমিত জীবনেই ফলিয়ে গেছেন চিরায়ত সাহিত্য ও শিল্পকর্ম। নিবেদিতপ্রাণ মহৎ দার্শনিক, বিজ্ঞানী অতন্দ্র সাধনায় জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন নব নব আবিষ্কারের অজস্র সম্পদে। মহৎ ধর্মসাধক, দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক, রাষ্ট্রনায়কদের সীমিত খণ্ড-পরিসর জীবনের মহৎ অবদান ও ভূমিকায় অর্জিত হয়েছে মানুষের সমাজ ও সভ্যতার নব নব অগ্রগতি। এসব মহামানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েই পেয়েছেন সাফল্যের স্বর্ণমুকুট। মর জীবনে অর্জন করেছেন অমরত্বের মহিমা। তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নিলে আমরা সময়ের মূল্য বুঝতে পারি। হতে পারি সময়ানুবর্তী ও সময়-সচেতন।

উপসংহার: আধুনিক কালে জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে জটিল ও বহুমুখী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্র অকল্পনীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। জীবন সংগ্রামে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পারিবারিক, শিক্ষাগত, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক জীবনে নিত্য নতুন পরিস্থিতিতে অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বিনোদনেও প্রচুর সময় দিতে হয়। তাই সময়ের ব্যবহার হওয়া চাই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ। তাহলেই স্বপ্নিল জীবনে আসবে সার্থকতা। সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্বটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার নয়, জাতীয় জীবনেও তার গুরুত্ব অপরিসীম। একশ শতকের পৃথিবী আজ বিস্ময়কর গণিতে আগুয়ান। সুপরিকল্পিত সময়নিষ্ঠ ছাড়া আমাদের দেশ ও জাতি কি পশ্চাৎপদ জিবনকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে? এক্ষেত্রে সফল হতে হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে চাই সময়নিষ্ঠার ছাড়পত্র।
 নারী শিক্ষার গুরুত্ব

ভূমিকা: নারী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অপরিহার্য বিষয় হিসেবে জড়িত। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। একুশ শতকে পদার্পণ করে বর্তমান বিশ্ব যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবন-যুদ্ধের অন্যতম শরিক ও সাথী। কিন্তু অজ্ঞানতার অন্ধকারে পিছিয়ে পড়া নারীর পক্ষে সেই প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। তাই আজ দাবি উঠেছে নারী শিক্ষার।

নারী শিক্ষার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এককালে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর ছিল প্রাধান্য। তাই প্রাচিন হিন্দু-বৌদ্ধ সাহিত্যে শিক্ষিত নারীর দেখা মেলে। কিন্তু পরবর্তীকালে সমাজে পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে নারী হয়ে পড়ে অন্তঃপুরবাসী। আধুনিক কালে নারীর স্বতন্ত্র মানবিক ভূমিকা স্বীকৃত হয় পাশ্চাত্যে। ভারতে ইংরেজ শাসন শুরু হলে উপমহাদেশে লাগে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাওয়া। সে হাওয়ায় নারী আবার শিক্ষার অঙ্গনে আসার সুযোগ পায় ইউরোপীয় জীবন-ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সমমর্যাদা এবং অবাধ মুক্ত জীবনছন্দ এদেশের নবজাগ্রত বুদ্ধিজীবী মানসে ঢেউ তোলে নারী-প্রগতির ভাবপ্রবাহের। সেই ভাবপ্রবাহে আলোকিত হয়ে রামমোহন, বিদ্যাসাগর প্রমুখ দেশব্রতী বাঙালির অক্লান্ত প্রচেষ্টায় অবিভক্ত বাংলায় নারী শিক্ষা ও নারী প্রগতির রুদ্ধ দুয়ার যায় খুলে। কিন্তু তখনও বাংলাদেশের মুসলমান নারীসমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথে বাধা দূর হয় নি। ধর্মীয় কুসংস্কার সেখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে বাধা কাটিয়ে মুসলমান নারীকে শিক্ষার অঙ্গনে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে বেগম রোকেয়া। ক্রমে বাঙালি মুসলিম নারীরাও আধুনিক শিক্ষার পথে পা বাড়াতে থাকেন। ইংরেজ আমলে নারী শিক্ষার যে বিকাশ ঘটেছিল তার মোটামুটি ফল হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে সহ-শিক্ষার প্রবর্তন। মাধ্যমিক পর্যায়ে ছিল ছেলে ও মেয়েদের জন্যে আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা, যদিও কোনো কোনো উচ্চবিদ্যালয়ে সহ-শিক্ষা চালু হয়েছিল। পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-শিক্ষার প্র্রচলন হয়, আবার একই সঙ্গে কেবল মেয়েদের জন্যে কিছু আলাদা কলেজও গড়ে ওঠে। এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা ছিল পুরুষদের চেয়ে অনেক অনেক পিচিয়ে।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারী শিক্ষা: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। সমাজে নারী-পুরুষের সমান মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। দেশে নারী আন্দোলন ও সংগঠনের কার্যক্রম, বিশ্বপরিসরে নারী মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্রের প্রেক্ষাপটে জীবন ও জীবিকার নানা স্তরে নারীরা এগিযে আসতে থাকে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে প্র্রতিযোগিতায় নারীসমাজে সৃষ্টি হয় নতুন উদ্দীপনা। বর্তমানে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পুরুষের চেয়ে ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হওয়ায় তা নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা ও নতুন ইতিবাচক মাত্রা যোগ করেছে। এখন এমন কোনো গ্রাম বাংলাদেশে নেই যেখানে কোনো শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নারীর দেখা পাওয়া যাবে না।

নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা: নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা মাত্র ২৬ শতাংশ। এবং দেশের ব্যাপক সংখ্যক নারী এখনও কুসংস্কার ও অজ্ঞাত অন্ধকার কাটিয়ে এগিয়ে আসতে পারে নি। ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা আমাদের দেশে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে পর্দার কড়াকড়ির কারণে অনেক মুসলিম নারী ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাঙ্গনে এগিয়ে আসতে পারছে না। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ও চরম দারিদ্র্য নারী শিক্ষার পথে বাধা হিসেবে রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক নারীকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জগতে নিয়ে আসার জন্যে যে বিশাল উদ্যোগ, আয়োজন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো দরকার তা আমাদের নেই। শিক্ষার হার বৃদ্ধির প্রচলিত ধারায় এগুলে এদের সবার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে যে বেশ কয়েক যুগ লেগে যাবে তাতে সন্দেহ নেই।

নারী শিক্ষা প্রসারের উপায়: সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় বাধা ছিন্ন করে নারীসমাজ যাতে শিক্ষার আলোতে উদ্ভাসিত হতে পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজন প্রচলিত ধারার পাশাপাশি বিশেষ ধরনের শিক্ষা পরিকল্পনা। সে ক্ষেত্রে রেডিও, টিভি ইত্যাদি মাধ্যম, লোকরঞ্জনমূলক শিক্ষা কর্মসূচি, কর্মমুখী শিক্ষা কর্মসূচি ইত্যাদি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। যেহেতু নিরক্ষর নারীর প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামে বসবাস করে তাই এসব কর্মসূচিকে গ্রামীণ সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন হবে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন।

(১) সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেন, স্কুলগামী ছাত্রী কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রয়োজনে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা।

(২) সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি নারীর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ। এজন্যে আশু কর্মসূচি হিসেবে গ্রাম পর্যায়ে শিক্ষার্থী মেয়েদের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছোট ছোট স্কুল স্থাপন যেন বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব বেশি না হয়। রক্ষণশীল এলাকার ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য হবে আলাদা স্কুল।

(৩) শিক্ষা গ্রহণে নারীকে উদ্যোগ ও উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার যে উপবৃত্তি চালু করেছেন তা যেন যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয় সেজন্যে এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা।

(৪) শিক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ দালানকোঠা ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে কাজে লাগানোর জন্যে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সেক্ষেত্রে তত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব প্রদান।

(৫) সারা দেশে নারী শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্দোলনে কায়েমি স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী চাটুকারদের বাদ দিয়ে শিক্ষানুরাগী সম্প্রদায়কে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষকদের এই কাজে বিশেষভাবে নিয়োগ প্রদান এবং এজন্যে প্রয়োজনে তাঁদেরকে বিশেষ ভাতা প্রদান।

(৬) ধর্মীয় বাধা, সামাজিক কুসংস্কার, আর্থিক দারিদ্র্য ইত্যাদি অন্তরায় কাটিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর এগিয়ে আসার জন্যে সামাজিক প্রণোদনা সৃষ্টি করা এবং সেজন্যে দেশে নারী মুক্তি আন্দোলন জোরদার করা। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক-সংস্কৃতিক সংগঠনকে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে এসে সেগুলোকে কাজে লাগানো।

উপসংহার: একুশ শতক যুক্তি, বিজ্ঞান, মনন ও বিশ্বমানব মৈত্রীর শতক গণতন্ত্র, অগ্রগতি ও প্রগতির শতক। ধর্মীয় বাধা, সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীকে এগিয়ে আসতে হবে মানুষের ভূমিকায়। উৎকট আধুনিকতা ও স্থূল রুচিবিকৃতির পিচ্ছিল পথে পা না বাড়িয়ে শোভন রুচিময় আলোকিত মানুষ হিসেবে তাদের গড়ে উঠতে হবে। পরিভোগপ্রবণ সমাজে নারী যেন নিছক পণ্যে পরিণত না হয়, সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে নারীসমাজকে। সামাজিক স্বাস্থ্যের পক্ষে যা কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ তার বিরুদ্ধে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে ব্রতী হতে হবে সামাজিক আন্দোলনে। যুগ যুগ ধরে যে নারী চোখের জলের কোনো মূল্য পায় নি, যে নারী ব্যবহৃত হয়েছে অন্তঃপুরের খেলার পুতুল হিসেবে, আধুনিক সমাজে সে নারীকে দাঁড়াতে হবে শিক্ষিত, মার্জিত, আলোকিত মানুষ হিসেবে। তাহলেই সমাজে ফিরে আসবে নারীর মর্যাদা। এক্ষেত্রে নারী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
 দুর্নীতি ও তার প্রতিকার

ভূমিকা: বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে দুর্নীতি বোধ হয় সবচেয়ে মারাত্মক- কারণ এই ব্যাধি সানসিক এবং তা সারানো খুব সহজ নয়। দুর্নীতিই আজ এক শ্রেণীর মানুষের কাছে নীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে, সমাজের একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতি তার থাবা বিস্তার করেছে। এ অবস্থায় জাতীয় উন্নয়নে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত না হয়ে পারে না।

দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপ: বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্নীতির আবর্তে নিমজ্জিত। সে দুর্নীতির অবস্থান দেখা যায় সর্বত্র। ঋণ নিয়ে বেমালুম হজম করে ফেলা, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস চুরি, আয়কর-বিক্রয়কর ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া, চাকরির নামে হায় হায় কোম্পানি খোলা, হীনস্বার্থে শেয়ার-বাজার কারচুপি, চোরাচালানি, কালোবাজারি, ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস- দুর্নীতি কোথায় নেই? এমনকী দুঃস্থ মায়েদের জন্যে বরাদ্ধকৃত গম নিয়ে, এতিমখানার এতিমদের জন্যে বরাদ্দকৃত বস্ত্র নিয়ে, দুর্গত মানুষের জন্যে বরাদ্দকৃত ত্রাণের টিন নিয়েও দুর্নীতি হয়েছে। পরীক্ষার হলেও দুর্নীতি আধিপত্য বিস্তার করছে। ভাবা যায় না, মেধা তালিকায় স্থান নির্ধারণেও চলে দুর্নীতি। সরকার দুর্নীতি দমন সংস্থা করেছেন দুর্নীতি সামাল দিতে। কিন্তু বিগত সরকারগুলোর আমলে দেখা যায়, দুর্নীতির ভূত সেখানেও আছর গেড়েছে। অসহায় মানুষ সেখানে ন্যায় বিচার আশা করে, সেই বিচার ব্যবস্থায় আইনের শাসনের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতির সর্বগ্রাসী রূপের জন্য সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের সারিতে। ব্যাপক দুর্নীতির জন্য দেশবাসীরেক উচ্চমূল্য দিয়ে বিপুল ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে দুর্নীতির ভয়াবহ ছোবলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন জর্জরিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ সবকিছুকেই কলুষিত করেছে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মামলাবাজি, টোলবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়েছে সন্ত্রাসী চরিত্র, যাকে বলা চলে সন্ত্রাসী দুর্নীতি।

দুর্নীতি উন্নয়নের অন্তরায়: বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। মাথাপিছু বার্ষিক আয় দ্বিগুণ করা, সমৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দারিদ্র্য বিমোচন করার অনেক সুযোগ এখন আমাদের সামনে এসেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ফলে প্রত্যাশিত উন্নয়ন সার্বিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, লণ্ঠিত হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সেগুলো পাচার করা হচ্ছে বিদেশে। জনগণের দুঃখ ও দারিদ্র্যের অবসান তো দূরের কথা, তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সৃষ্টি হচ্ছে বিপুল ধনবৈষম্য। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দাতাদেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে দুর্নীতিকে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুর্নীতির মূলোৎপাটন: দুঃখের ও লজ্জার বিষয় হল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নির্দেশিকায় সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় প্রথম সারির নিন্দিত স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এ গ্লানি দূর করার জন্যে সমগ্র জাতির সামনে এখন অন্যতম প্রধান করণীয় হচ্ছে দুর্নীতির মূলোৎপাটন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর ছাড়া এই দুর্নীতির ঘুণ থেকে আমাদের রেহাই নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে, দুর্নীতি বিরোধী গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে আগামীতে হয়ত এই সম্ভাবনার পথ খুলে যাবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয়: আমরা জানি, কালো টাকা, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক গাঁটছড়া দুর্নীতিকে দিয়েছে ভয়াবহ ও অবিশ্বাস্য ব্যাপ্তি। ফলে দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা, কর্ম ও জীবনাচরণ নিয়ন্ত্রণকারী সব কিছুই বর্তমানে দুর্নীতির রাহু কবলিত। রাজনীতি, অর্থনীতি, আহার্য, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবিকা সবই যদি দুর্নীতির অক্টোপাসের কবলে পড়ে তবে দেশ ও জাতি অনিবার্য পতনের দিকে না যেয়ে পারে না। এ প্রেক্ষাপটেই আমাদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে, অনেক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের যেহেতু দেশের উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক তাই এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল ও সুনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই লাইনচ্যুত দেশকে আবার উন্নয়নের সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে হবে। যেহেতু বিচার বিভাগের দুর্নীতির বিস্তার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পথ খুলে দিয়েছে তাই উন্নয়নের স্বার্থে এ ক্ষেত্রেও সংস্কার অনিবার্য।

দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বেড়াজাল থেকে দেশকে মুক্ত করার জরুরি পদক্ষেপ আজ সময়ের দাবি। এটা কঠিন কাজ। কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে দেশপ্রেমিক ত্যাগী অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের মহিমা অর্জন করতে হবে। সব রাজনৈতিক এবং সকল রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে একযোগে নিতে হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। এক্ষেত্রে তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধতা। সেই সাথে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সকল পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন: সম্প্রতি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা ইত্যাদি পর্যায়ে লাগামহীন দুর্নীতি বিস্তারের ঘটনা ধরা পড়ায় দেশবাসী স্তম্ভিত। বনরক্ষকের দুর্নীতির ঘটনা রূপকথার কাহিনীকেও হার মানিয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে তা প্রতিরোধে আইন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা প্রয়োজন। তবে কেবল আইন পরিবর্তন করে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ আইন প্রযোগকারী সংস্থার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতির অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, জনপ্রতিনিধি, আমলা, পুলিশ, কর্মচারী ও পেশাজীবীদের চিহ্নিত, অপসারিত, ক্ষমতাচ্যুত ও সমাজ-নিন্দিত করতে হবে। দিতে হবে উপযুক্ত শাস্তি। আর সেখানে দেশপ্রেমিক, কল্যাণব্রতী নতুন মানুষকে নিয়োগ দিতে হবে।

উন্নত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে গড়ে তুলতে হবে দেশব্রতী মানবদরদী নতুন সমাজ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা জাগিয়ে নতুন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ জন্যে রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল স্লোগান হতে পারে “দুর্নীতি করে যে দেশের ক্ষতি করে সে”, “দুর্নীতি রোধ কর, উন্নয়নের হাল ধর”।

উপসংহার: দুর্নীতির মূলোৎপাটনে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। নির্লোভ, সৎ ও দেশব্রতী কর্মীদের যুক্ত করতে হবে এই কাজে। একই সঙ্গে তরুণ সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষকে আজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। গণমাধ্যম, বেসরকারি সেবা সংস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারে এ ধরনের সংগঠনগুলো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্ক পচন ধরলে শরীরের কোনো অঙ্গ যেমন যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না তেমনি রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে স্বচ্ছন্দ উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ সক্রিয় ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারে না। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও প্রত্যাশিত উন্নয়নের জন্য তাই সুশাসনের বিকল্প নেই।
 মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার

ভূমিকা: মানব সত্যতা যখন বিস্ময়কর সম্ভাবনা দিয়ে নতুন সহস্রাব্দে এসে দাঁড়িয়েছে তখন আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের বিশাল উল্লেখযোগ্য অংশ আক্রান্ত এক সর্বনাশা মরণ নেশায়- সে নেশা মাদকের। এক গভীর ষড়যন্ত্রের শীকার আমাদের তরুণেরা। যে তরুণের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধজয়ের, তাদের সেই ঐতিহ্যকে নস্যাৎ করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র। তাদের ভবিষ্যৎকে অসাড়, পঙ্গু ও ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যে চলেছে ভয়ঙ্কর এক চক্রান্ত। জাতির মেরুদণ্ডকে অথর্ব করে দেওয়ার জন্যে তাদের ছলে-বলে-কৌশলে টেনে নেওয়া হচ্ছে নেশার করাল বলয়ে। আর তার ফলে মাদক নেশার যন্ত্রণায় ধুঁকছে শত সহস্র প্রাণ। ড্রাগের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার দুঃসাহস হারিয়ে ফেলছে দুর্মর তরুণ্য।

সর্বনাশা নেশার উৎস: নেশার ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও তা ছিল অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, চরস, তামাকের নেশার কথা শুনে এসেছে মানুষ। উনিশ শতকের মধ্যেভাগে বেদনানাশক ওষুধ হিসেবে যে মাদকের ব্যবহার শুরু হয় তার ইংরেজি নাম ড্রাগ। ফরাসি বিপ্লবের সময় পরাজিত সৈনিকদের অনেকে হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকের আসক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কালেও নানা কারণে ব্যথা উপশম ছাড়াও নেশার উপকরণ হিসেবে ড্রাগের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ব্রাজিল, ইকুয়েডর ইত্যাদি এলাকায় মাদক ড্রাগ তৈরির বিশাল বিশাল চক্র গড়ে ওঠে। এভাবেই বেদনানাশক ‘ড্রাগ’ ক্রমে পাশ্চাত্যের ধনাঢ্য সমাজে এক ব্যাপক নেশার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে জানা যায়, ধনাঢ্য দুনিয়ার শতকরা আশিভাগ লোক একসময় কমবেশি ‘ড্রাগ’-এর নেশার কবলে ছিল। আর এখন আমাদের মতো দরিদ্র দেশেও তা মারাত্মক সংক্রামক অভিশাপের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। দু’বেলা যেখানে সবার ভাত জোটে না সেখানেও যত্রতত্র এমনকি দ্ররিদ্র্য-পীড়িত বস্তি এলাকায় ড্রাগের সহজ প্রাপ্তি দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ ও তাদের ব্যবহারের ধরন: সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মদতপুষ্ট ড্রাগ ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের মাদক ড্রাগের ব্যবসা ফেঁদেছে। এই ধরনের মাদক ড্রাগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইয়াবা, আফিম, হাসিস, হেরোইন, কোকেন, হেম্প, মারিজুয়ানা, ব্রাউন শুগার, এল.এস.ডি. স্মাক ইত্যাদি। এসবের ব্যবহারের পদ্ধতিও নানা রকম। ধূমপানের পদ্ধতি, ‘ইনহেল’ বা নাকে শোকার পদ্ধতি, ‘স্কিন পপিং’ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ত্বকের নিচে গ্রহণের পদ্ধতি এবং ‘মেইন লাইনিং’ বা সরাসরি রক্ত প্রবাহে অনুপ্রবেশকরণ পদ্ধতি। বিভিন্ন রকম ড্রাগের মধ্যে ইয়াবা আজ সব নেশাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই মাদক শক্তিও অত্যন্ত তীব্র। আরেক মরণ নেশার নাম হেরোইন। এক গ্রাম হেরোইনের ষোল ভাগের এক ভাগ দু-তিনবার ব্যবহার করলে এমন আসক্তি সৃষ্টি হবে যে আসক্ত ব্যক্তি সহজে আর এই নেশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। নিছক কৌতূহলবশত যদি কেউ হেরোইন সেবন করে তবে এই নেশা সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো তার ঘাড়ে চেপে বসে। তখন প্রচন্ড মানসিক শক্তি এবং চিকিৎসকের অনুপুঙ্খ পরিচর্যা ছাড়া আসক্ত ব্যক্তি এ নেশার কবল থেকে সহজে মুক্তি পায় না।

মাদকাসক্তির পরিণাম: ড্রাগ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের ভাড়াটিয়া লোকের পাল্লায় কিংবা অসৎ লোকের প্ররোচনায় পড়ে অথাব নিতান্ত কৌতূহলবশত কেউ ড্রাগের নেশায় পড়লে সর্বনাশা নেশা তাকে পেয়ে বসে। নেশার কারাগারে বন্দি হয়ে দিনের পর দিন তাকে ড্রাগ ব্যবহার করতে হয়। মাদকাসক্তির ফলে তার আচার-আচরণে দেখা যায় অস্বাভাবিকত্ব। তার চেহারার লাবণ্য হারিয়ে যায়। আসক্ত ব্যক্তি ছাত্র হলে তার বইপত্র হারিয়ে ফেলা, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, হেরোইনের খরচ জোগাতে চুরি করা ইত্যাদি নতুন নতুন উপসর্গ ধরা পড়ে। হেরোইনের প্রভাবে রোগীর শারীরিক প্রতিক্রিয়াও হয় নেতিবাচক। ড্রাগ নেওয়া শুরু করলে তার শরীরে অতিরিক্ত সুখের অনুভূতি হয়। শরীর মনে হয় পালকের মতো হালকা। তার স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, মননশক্তি ভোঁতা ও অসাড় হয়ে পড়তে থাকে। ক্ষুধামান্দ্যের ফলে শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। তার শরীর ভেঙে পড়ে এবং ক্রমে স্নায়ু শিথিল ও অসাড় হয়ে শেষ পর্যন্ত সে মারাক্তক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

মাদক-নেশা দ্রুত প্রসারের কারণ: বিশ্বব্যাপী সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, মূলত কাজে-কর্মে, শিক্ষা-দীক্ষায় পিছেয়ে পড়ার কারণে প্রায় ক্ষেত্রে হতাশ তরুণরা সাময়িক ভালো লাগার আকর্ষণে নেশা-কবলিত হয়। বিশেষ করে নৈরাশ্য, হতাশা, সামাজিক অস্থিরতা এবং জীবনের অর্থশূন্যতা ও দুঃখবোধ থেকে সাময়িক স্বস্তি লাভের আশা থেকেই এই উৎকট নেশা ক্রমবিস্তার লাভ করছে। পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, সর্বাধুনিক সভ্যতাগর্বী অনেক দেশে বিপথগামী মানুষ এবং বহুজাতিক সংস্থা উৎকট অর্থলালসায় বেছে নিয়েছে রমরমা মাদক ব্যবসার পথ। নেশার ঐ কারবারিরা সারা বিশ্বে তাদের ব্যবসায়িক ও আরোও কিছু হীন স্বার্থ রক্ষায় এই নেশা পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে মাদকাসক্তির কারণ হিসেবে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত, সমাজজীবনে সুস্থ বিনোদনের অভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে বলে সহজেই মানুষ নেশার কবলে পড়েছে।

মাদক চোরাচালান: সীমান্তপথে কিংবা আকাশপথে চোরাচালানের মাধ্যমে ড্রাগ পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক বেশ কিছু চোরাচালানি সিন্ডিকেট। কিছুকাল আগেও মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের স্বর্গভূমি- ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ বা ‘স্বর্গ ত্রিভুজ’। ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ’স্বর্ণ ত্রিভুজে’র রমরমা অবস্থান যায় ভেঙে। কিন্তু চোরাচালানি চক্র কিছুদিনের মধ্যেই ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে নিয়ে গড়ে তোলে ড্রাগ পাচারের নতুন স্বর্গভূমি ‘গেল্ডেন ক্রিসেন্ট’।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধ: ড্রাগ-ড্রাগন বিশ্বজুড়ে যে মাদক বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার কালো থাবা থেকে নিজেদের বাঁচাবার উপায় কী? এ সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা হিমশিম খাচ্ছেন। সমাজসেবীরা উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ১৯৮৬ সালে মাদকাসক্তি বিষয়ক এক দলিলে এই অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী হেরোইনের প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। তাহলে কি মানুষ পৃথিবীতে মাদক নেশার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না? সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ কি এই সর্বনাশা নেশার কবলে ক্রমে নিঃশেষ হয়ে যাবে? এই প্রশ্ন সামনে রেখেই বিশ্বব্যাপী বিবেকবান মানুষ মাদকবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। দেশে দেশে মাদকবিরোধী সংস্থা ও সংগঠন গড়ে উঠছে। তারা মাদক বিরোধী গণসচেতনতা গড়ে তোলার কাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। এসব তৎপরতার লক্ষ্য হচ্ছে:

১। ড্রাগ আসক্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে ভেষজ চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা;
২। ব্যাপক সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা ও সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে, তরুণদের সম্পৃক্ত করে নেশার হাতছানি থেকে তাদের দূরে রাখা;
৩। মাদকাসক্তির কুফল ও মর্মান্তিক পরিণতি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সকলকে সচেতন করা;
৪। মাদক ব্যবসা, চোরাচালানের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা; এবং
৫। বেকার যুবকদের জন্যে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

উপসংহার: মাদকাসক্তির মতো সর্বনাশা নেশার করাল গ্রাসে পড়ে আমাদের তরুণ প্রজন্ম অথর্ব ও অসাড় হতে চলেছে- এ দেখে সর্বস্তরের মানুষ আজ শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। এটি সমস্যা মোকাবেলায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক। এ মারাত্মক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থেকে আগামী দিনের সুস্থ, সুন্দর, আনন্দ-উজ্জ্বল সমাজ জীবন গড়ে তোলার লক্ষে আমাদের মাদকদ্রব্য ব্যবহার রোধ করার বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদকাসক্তি নিরোধকল্পে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, মাদকজাত ওষুধের ব্যবহার বন্ধ করা একান্ত দরকার। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের মাদক বিষ বর্জনকেও তারা অপরিহার্য বলে বিবেচনা করেছে। মাদক নেশার বিরুদ্ধে একসময় রবীন্দ্রনাথসহ অনেকেই কলম ধরেছিলেন। আজ মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে উদ্বুদ্ধ করায় আমাদের শিল্পী-সাহিত্যিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, ড্রাগ-ড্রাগনের রাহুগ্রাস থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, দল-মত-নির্বিশেষে আমাদের সবার।
 নারীর ক্ষমতায়ন

ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যে বিষয়গুলো আলোচনার ঝড় তুলেছে নারীর ক্ষমতায়ন এর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে নারীর যে মানবেতর অবস্থান কেবল তা থেকে মুক্তিই নয়, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রিক যে- কোনো ধরনের সমস্যা সমাধান ও নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণকে অন্যতম অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ক্ষমতায়ন কী: ‘ক্ষমতায়ন’ শব্দটি তুলনামূলকভাবে নতুন। ক্ষমতায়ন বলতে মূলত বোঝায় নারীর স্বাধীনতা ও সকল ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ- বস্তুগত, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ। নারীর ক্ষমতায়নের অর্থই হলো, সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন একটি সুস্থ পরিবেশ থাকবে যেখানে নারী আপন মহিমায় স্বাধীন ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠবে; নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে বস্তুগত, মানবিক ও জ্ঞান সম্পদের উপর। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নারীর শিক্ষা প্রসার এবং দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন। নারী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সুফিয়া কামালও নারীর বন্ধনমুক্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য: শিশুকাল থেকে নারীর ভেতর বপন করা হয় নীচতার এক বীজ। এর জন্যে অনেকখানি দায়ি পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ, ধর্মীয় গোঁড়ামি। ক্ষমতায়নের লক্ষ্যই হলো পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ ও অধস্তনতার অনুশীলনকে রূপান্তর করা। একমাত্র সম-অংশীদারিত্বেই ক্ষমতায়নের ভিত্তি প্রস্তুত হয়। নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নির্যাতক ও শোষকের অবস্থান থেকে পুরুষকে মুক্ত করা। বিদ্যমান সমাজে পুরুষের দায়িত্বের পাশাপাশি নারীর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা, পুরুষের অধিকারের পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা। সম অধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে পুরুষরা গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবে, পাশাপাশি নারীরাও পুরুষের দায়িত্ব পালনে সমানভাবে অংশ নেবে। ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত কায়রো সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকেই বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ১৭৯টি দেশের অংশগ্রহণে ১১৫ পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাবনায় সাম্য, ন্যায়বিচার, সন্তান ধারণের প্রশ্নে নারীর ইচ্ছার প্রাধান্য, নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রভৃতি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতা: দু-একজন নারী সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা মুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেই নারীর ক্ষমতায়ন হয় না। নারীর ক্ষমতায়ন দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ যে নারী তাদের সঠিক ক্ষমতায়নকে বোঝায়। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রধান দুটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে:

ক. প্রচলিত মূল্যবোধ ও আইনের সীমাবদ্ধতা: সমাজে প্রচলিত মূল্যবোধ নারীকে পুরুষের অধস্তন করে রাখে। শিশুবয়স থেকেই নারী দেখে সমাজে পুরুষদের প্রভাব। শিশুকাল থেকেই সে আচার-আচরণ, পোশাক, চলাফেরা ও কথা বলার ধরন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্নধর্মী নিয়মের জালে আবদ্ধ হয়ে যায়। পিতৃতন্ত্রের পক্ষে এমন সব মূল্যবোধ তৈরি হয় যা নারীকে ছুড়ে ফেলে দেয় অন্ধকার আবর্তে। নারী শিক্ষার সুযোগ পায় না, স্বাবলম্বী হতে পারে না; সর্বোপরি আর্থিক বা মানসিকভাবে তাকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।

প্রচলিত আইনও নারীর বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। সংবিধানে নারী-পুরুষের সম অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ হচ্ছে না। যৌতুক, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ প্রভৃতি অপরাধে শাস্তির বিধান থাকলেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় অপরাধী। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিয়ে, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব- সব ক্ষেত্রেই আইনের কাঠামোগত দুর্বলতায় নারী হয় বঞ্চিত। দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে যে সন্তানকে সে জন্ম দেয়, বড় করে, সে সন্তানের অভিভাবকত্ব পায় না নারী। সম্প্রতি বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে নারী পুরুষের অর্ধেক পায়, হিন্দু নারীরা কিছুই পায় না।

খ. পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল ধর্মান্ধ মানসিকতা: সমাজে রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন কিছু লোক নারীকে সর্বক্ষেত্রে অবদমিত করে রাখতে চায়। নারীমুক্তিকে তারা ধর্মের চরম অবমাননা বলে ভাবে। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন নিয়মের জালে তারা নারীসমাজকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। আজও গ্রামবাংলার বহু নারী রক্ষণশীল ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন কিছু লোকের ফতোয়ার শিকার। এটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

প্রচার মাধ্যমগুলোতে নেতিবাচক ভাবে নারীকে উপস্থাপন: প্রচার মাধ্যমগুলোতে নারীকে সবসময় পুরুষের অধস্তন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞাপন চিত্রে অহেতুক নারীর উপস্থিতি টেনে আনা হয়। চলচ্চিত্র কিংবা নাটনে নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন শাড়ি কিংবা গয়না ছাড়া নারীদের আর কিছুই চাইবার নেই। গণমাধ্যমে নারীকে হীনভাবে উপস্থাপন করার জন্যে নারীরাও অনেকাংশে দায়ী।

ক. নারীর স্বার্থ রক্ষাকারী আইন প্রবর্তন: বিয়ে, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তান ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা, সম্পত্তিতে সম অধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব প্রভৃতি বিষয়ে সনাতন আইন পালটে নারী-পুরুষের সমান স্বার্থ রক্ষাকারী আইন প্রবর্তন করতে হবে।

খ. শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ: নারীকে নিজ নিজ অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্যে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নারীকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী সতামতের প্রাধান্য দিতে হবে।

গ. প্রচার মাধ্যমগুলোতে নারীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন: প্রচার মাধ্যমে নারীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা চলবে না। যথাযোগ্য সম্মানের সাথে এবং রুচিসম্মতভাবেই গণমাধ্যমগুলোতে আসবে নারী চরিত্র।

ঘ. নারীর কাজের স্বীকৃতি: নারীকে তার কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। সন্তান লালন ও গৃহস্থালি কাজকে কিছুতেই ছোট করে দেখা চলবে না। বরং পুরুষকেও এসব কাজে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে যাতে নারী-পুরুষ উভয়ই ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজে অংশ নিতে পারে।

ঙ. রক্ষণশীল মানসিকতার পরিবর্তন: ধর্মকে পুঁজি করে রক্ষণশীলদের যে ফতোয়াবাজি তা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

উপসংহার: এঙ্গোলস তাঁর ‘অরিজিন অব দ্যা ফ্যামিলি’ গ্রন্থে বলেছেন, “নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কমংকাণ্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।” আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক একথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। নারী স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মতামত প্রদানে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে নারীর ক্ষমতায়নে আর কোনো অপশক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

      অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সমাজ

ভূমিকা: আধুনিককালে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে নারী সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ও ফলপ্রসূ অবদান রাখছে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর সুপ্রাচীন ভূমিকা: অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ঐতিহাসিক ভূমিকা আমাদের স্বরণে রাখতে হবে। সুপ্রাচীনকাল থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, নারীই প্রথম কৃষিকাজের সূচনা করে। পুরুষরা যখন শিকারে যেত তখন নারী বাড়ির আশেপাশে ফলের বীজ ছড়িয়ে দিত, চারা লালন করত, এভাবেই মানব সমাজে কৃষির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। কুটির শিল্পের বিকাশেও নারীর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। ঘরে বসে অবসরে বাঁশ, বেত ইত্যাদি দিয়ে নানা রকম হাতের কাজ তারাই প্রথম শুরু করে। এভাবেই কুটির শিল্পের সূচনা ও প্রসার ঘটে। পারিবারিক কাজে, সমাজের মঙ্গলে ও দেশের উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা ও অবদান ইতিহাস-স্বীকৃত।

নারীর শ্রমের মূল্যায়নে সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে নারী সমাজ প্রথাবদ্ধ সংস্কার ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক নানা সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। সন্তান ধারণ, সন্তান প্রতিপালন, গৃহকর্ম সম্পাদনসহ নানা কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে দৈনিক গড়ে তিন ঘণ্টা বেশি পরিশ্রম করলেও তার উপযুক্ত স্বীকৃতি মেলে নি। গৃহস্থালী এবং পারিবারিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কাজে নিয়োজিত নারীশ্রম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে গণ্য হলেও জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না।

জাতীয় অর্থনীতিতে নারীশ্রমের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব: বিগত প্রায় অর্ধশতক ধরে সংগঠিত নারী মুক্তি আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি, নারীর ক্ষমতায়নে নতুন ধ্যান-ধারণার বিস্তার ইত্যাদি অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বর্তমানে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের পথ অধিকতর প্রশস্ত হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাজে ক্রমবর্ধমান অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমশক্তি: বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার কাজে দশ হাজারের বেশি নারী কাজ করে। ৮০ শতাংশ নারী মৎস্য, বনায়নসহ কৃষি খাতে নিয়োজিত। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এই নারী শ্রমিকরা পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছ। শহরে শিক্ষিত নারীদের বড় অংশ নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতা ও স্বাস্থ্য কার্যক্রমে, অভ্যর্থনা ডেস্কে ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ও এনজিওতে, প্রশাসনে ও ব্যবস্থাপনায়।

উদ্যোক্তা হিসেবে নারী: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ কিছু নারী উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছেন। এঁদের ক্রমপ্রসারমান উদ্যোগ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা বেশি সক্রিয় শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উপার্জনশীল অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে কাপড় সেলাই, নকশা, বাটিক, বুটিক, এমব্রয়ডারি ও খাদ্য সমগ্রী বিক্রয়। বিপণিকেন্দ্রগুলোতেও অনেক নারী উদ্যোক্তা নিয়োজিত আছেন। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পের মতো সংগঠিত শিল্প স্থাপনে কিছু কিছু নারী উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছেন।

উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের পথে অন্তরায়: অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায়। যেমন-
১। প্রায় ক্ষেত্রেই নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার;
২। চাকরি ও শ্রম বাজারে প্রবেশাধিকারের অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়;
৩। নিয়োগের সুযোগ থাকলেও নানা অজুহাতে নারীকে নিয়োগ-বঞ্চিত করা হয়;
৪। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও নারী সমাজ অনেক পিছিয়ে আছে।

নারী উদ্যোক্তারাও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। যেমন:
১। উপযুক্ত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অভাব এবং চলাফেরার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা নিজেদের ক্ষমতা ও সুযোগের যথাযথ সদ্ব্যবহার করতে পারে না;
২। ব্যবসায়িক উদ্যোগে ঝুঁকি নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা নানা সমস্যার সম্মুখীন;
৩। পুরুষ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে কঠিন;

এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সমাজ ধীর ধীর অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন। বাণিজ্যিক ও সেবা খাতে নারীর উদ্যোগ ক্রমেই বাড়ছে। শহরাঞ্চলে নারীদের মালিকানা ও পরিচালনায় বাটিক, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা ইত্যাদি ক্রমেই গড়ে উঠছে। বহু নারী মনোহারী দোকান, স্বাস্থ্য ক্লিকিন, ভ্রমণ এজেন্সি ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন।

উপসংহার: নারীরা যাতে অধিক হারে চাকরি ও শ্রমে নিয়োজিত হতে এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে সক্রিয় হতে পারে সে জন্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ সব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্যে শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র স্থাপন, সরকারি চাকরিতে নারী কোটা সংরক্ষণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শহরে ও গ্রামে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষায় নারীর সুযোগ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। আশা করা যায়, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ হলে অর্নৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারী সমাজ আরো ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

বৈশাখী মেলা

বৈশাখী মেলা নববর্ষের সর্বজনীন অনুষ্ঠানগুলোর অন্যতম। নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ, পহেলা বৈশাখ থেকে বাংলাদেশে  ছোট-বড় অনেক মেলা শুরু হয়। স্থানীয় লোকেরাই এসব মেলার আয়োজন করে থাকে। মেলার স্থায়ীত্বকাল সাধারণত এক থেকে সাত দিন। তবে কোথাও কোথাও এ মেলা সারা বৈশাখ মাস ধরে চলে। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ লোক সারা বছর বৈশাখী মেলার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকে। নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী মেলা থেকে সবাই সারা বছরের জন্য সংগ্রহ করে থাকে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার নেকমর্দানে পহেলা বৈশাখে যে মেলা বসে, তা হচ্ছে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ মেলা। সাধারণত এ মেলা এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। উত্তরবঙ্গের এমন বস্তু নেই যা এ মেলায় পাওয়া যায় না। এ মেলাকে সর্বসাধারণের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। নাচ, গান, নাগরদোলা প্রভৃতি মেলার হাজার বছরের ঐতিহ্য বলে বিবেচিত। মেলার দিনগুলোতে ছেলে-বুড়ো সবার মাঝেই বিরাজ করে সাজ সাজরব। বাংলাদেশের মেলাগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায় এদেশের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী, যা বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বলে বিবেচিত। বৈশাখী মেলা বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের মিলনমেলা। এ মেলা সকলের প্রাণে এনে দেয় খুশির বন্যা, ধুয়ে মুছে দেয় সারা বছরের কর্মক্লান্তি ও মানসিক অশান্তি। আমরা নতুন করে বাঙালি ঐতিহ্য লালন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা লাভ করি।

বাংলা নববর্ষ

বাংলা নববর্ষ

বাংলা প্রথম মাসের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়। এ দিনটি বাঙালির কাছে অন্যান্য দিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই নানা আয়োজনে এ দিনটিকে সাজানো হয়। এক সময় বাংলা নববর্ষ গ্রামীণ কৃষিনির্ভর ছিল। তখন খাজনা আদায়ের লক্ষে সম্রাট আকবর নববর্ষ প্রচলন করেন। বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। পয়লা বৈশাখ এ উৎসব পালিত হয়। পৃথিবীর যেখানে যত বাঙালি আছে, তারা সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ পালন করে। বাংলাদেশে একসময় এ দিনে ‘পুন্যাহ’ অনুষ্ঠান হতো জাঁকজমকভাবে। এখন হালখাতা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, কবিগান, কীর্তন, যাত্রা, বৈশাখী মেলা, আবৃত্তি-নাচ-গানে মুখরিত থাকে সারাদেশ। কোনো কোনো এলাকায় নৌকাবাইচ, হাডুডু, ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পালন করে তিন দিনব্যাপী আনন্দময় বৈসাবি উৎসব। পণ্ডিতরা মনে করেন মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন। এ দিনটা যেমন আনন্দ উল্লাসের জন্য তেমনি পরস্পর কুশল বিনিময় ও কল্যাণ কামনার জন্য। আমরা একে অন্যকে বলি, শুভ নববর্ষ। এ দিনে শহরাঞ্চলে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার চল হয়েছে ইদানীং। নতুন অথবা সুন্দর জামাকাপড় পরে সব বয়সের মানুষ বাংলা নববর্ষে আনন্দে মেতে উঠে। বাংলা নববর্ষ এখন আমাদের প্রধান জাতীয় উৎসব।

অনুচ্ছেদ

অনুচ্ছেদ নিয়ে ছাত্র এবং শিক্ষক সবার মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে শিক্ষার্থীদের জন্য আমার কিছু পরামর্শ।

অনুচ্ছেদ যেভাবে লিখতে হয় বা অনুচ্ছেদ রচনা লেখার নিয়ম বা পদ্ধতি:

Ø  অনুচ্ছেদ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে লিখার চেষ্টা করুন।
Ø  বিষয় সম্পর্কে বর্ণনা বা তথ্য প্রদান করে এমন বাক্য লিখার চেষ্টা করুন।
Ø  অনুচ্ছেদটি স্পষ্ট ভাষায় লিখার চেষ্টা করুন।
Ø  কঠিন শব্দাবলি এড়িয়ে চলুন।
Ø  এমন বাক্যগুলি অন্তর্ভুক্ত করুন যা বোধগম্য করে এবং বিষয়টির সাথে সম্পর্কিত।
Ø  বাক্যগুলি নির্দিষ্টক্রমে বা সুশৃঙ্খল হওয়া উচিত যেন তা বোধগম্য ভাব প্রকাশ করে।
Ø  একই বাক্যের যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
Ø  বাক্যগুলির প্রবাহ সঠিক রাখার চেষ্টা করুন।
Ø  বানান, বিরামচিহ্নগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।
Ø  অনুচ্ছেদটি খুব বেশি বড় করা যাবে না।
Ø  অনুচ্ছেদে একটি মাত্র প্যারা থাকবে।

Tuesday, July 28, 2020

মানব কল্যাণে বিজ্ঞান

ভূমিকা: বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রার এক যুগান্তকারী যুগ। একদা গুহাবাসী, অরণ্যচারী মানুষ বিজ্ঞানের বদৌলতে আজ ছুটে চলেছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অভাবনীয় বেগ, সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে করেছে দ্রুততর ও বহুমাত্রিক। ঘুচিয়ে দিয়েছে দূর-দূরান্তরের ব্যবধান। মানুষকে দিয়েছে অনিঃশেষ সম্ভাবনার অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা।

বিজ্ঞানের উদ্ভব: বিজ্ঞান শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান। অতি প্রাচীনকালে মানুষের বিশেষ কৌতূহলের চেতনায় বিজ্ঞানের আবির্ভাব ঘটেছিল। প্রাকৃতিক নানা বিষয় সম্পর্কে অন্বেষু দৃষ্টি মানুষের মনে বিজ্ঞানের প্রেরণা সঞ্চারিত করেছে। আর এই প্রেরণাই মানুষকে পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে এবং বিজ্ঞানকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

মানব সভ্যতায় বিজ্ঞান: প্রাচীন কালে, বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মানুষ ছিল প্রকৃতির হাতের এক অসহায় ক্রীড়নক। গুহাবাসী সেই পশুসদৃশ মানুষ যখন প্রথম পাথর ঘষে আগুন জ্বালায় তখন থেকেই শুরু হয় মানুষের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। তারপর সেখানেই বাধার সম্মুখীন হয়েছে, কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, মানুষ ব্যবহার করেছে বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ এখন সমগ্র পৃথিবীর ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। বিজ্ঞানই মানুষকে গুহাবাসী অবস্থা থেকে উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত করেছে।

বিজ্ঞানীর আত্মত্যাগ: বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানব সভ্যতাও অগ্রগতির দিকে এগিয়েছে। অতীতের সাথে বর্তমান পৃথিবীর তুলনা করলে এ সম্পর্কে কোনো সংশয় থাকে না। কিন্তু এই উন্নতির পেছনে অসংখ্য বিজ্ঞানীর অবদান সম্পর্কে চিন্তা করলে আপনা থেকেই আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। সত্য কথা বলেছিলেন বলে ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, ল্যাভয়সিয়েকে হত্যা করা হয়েছিল গিলোটিনে। মহান বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস, কোপর্নিকাস, গ্যালিলিও প্রমুখ অসংখ্য বিজ্ঞানী তাঁদের সমগ্র জীবন বিজ্ঞানের পিছনে ব্যয় করেছেন। তাঁদের অক্লান্ত সাধনার পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানে মানুষ এক অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের যুগে উন্নীত হয়ে সক্ষম হয়েছে।

মানব জীবনে বিজ্ঞানের বহুমাত্রিক অবদান: বর্তমান যুগে, মানব জীবনের বিভিন্ন শাখায় বিজ্ঞানের বহুবিধ অবদান পরিলক্ষিত হচ্ছে। যাতায়াত, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ মানব জীবনের বহুক্ষেত্রে বিজ্ঞান এক বিশাল ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানকে এখন বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর ফলে বিজ্ঞানকে মানব জীবনের বহুক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

কৃষি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: মানব সভ্যতার সূচনা লগ্নে মানুষ তার বৈজ্ঞানিক চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উর্বর জমিতে কৃষিকাজের উপায় উদ্ভাবন করে। বিজ্ঞানের বদৌলতে সেই কৃষিতে মানুষ এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মানুষ আবিষ্কার করেছে ট্রাক্টরসহ নানা রকম কৃষি সরঞ্জাম। আগে যেখানে নদী থেকে পানি তুলে সেচ দিতে হত, এখন তার পরিবর্তে মানুষ পাম্প ব্যবহার করে ভূঅভ্যন্তর থেকে পানি উত্তোলন করে সেচ কাজ সম্পন্ন করছে। কীটনাশকের সাহায্যে পোকামাকড় ও পঙ্গপালের হাত থেকে ফসল রক্ষা করছে। বর্তমানে ক্লোনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা উন্নত জাতের অধিক উৎপাদনশীল বীজ তৈরি করেছেন। এর ফলে মরুভূমির মতো উষর জায়গায় কৃষিকাজ সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনাবৃষ্টির অঞ্চলে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এভাবে খাদ্য উৎপাদনে বিজ্ঞান বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে।

যাতায়াত ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: বিজ্ঞান আর দূর-দূরান্তরকে করেছে নিকট। বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ আবিষ্কার করেছে দ্রুতগামী যানবাহন, বুলেট ট্রেন, শব্দাতিগ উড়োজাহাজ। আজ মানুষ পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে অপর প্রান্তের মানুষের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে পারে। টেলিভিশন, ফ্যাক্স, রেডিও, ই-মেইল ইত্যাদির মাধ্যমে সারা বিশ্বের খবর যে-কোনো মুহূর্তে পেয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, রকেটে করে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে পাড়ি জমাতে প্রস্তুত এখন মানুষ। পৃথিবীর বাইরের কৃত্রিম উপগ্রহগুলো হল বর্তমানের সর্বাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন নামক এই প্রক্রিয়ার দ্বারা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের খবরাখবর, তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করা যায়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে আলোক তন্তু নিয়ে এসেছে নতুন প্রযুক্তি। এর ফলে টেলিফোনে কথা বলার পাশাপাশি পরস্পরের ছবি দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেন করা যাচ্ছে কম্পিউটারের তথ্যাবলি। এভাবে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি সারা বিশ্বকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাফল্যগুলোও কম বিস্ময়কর নয়। জন্মপূর্ব রোগ নির্ণয়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় রকমের উত্তরণ ঘটেছে। জিন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা প্রয়োগিক ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্ভাবনা হাজির করেছে। কর্নিয়া (অক্ষিগোলকের স্বচ্ছ আবরণ), বৃক্ক, অস্থিমজ্জা, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এবং যকৃতের মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাফল্য অভাবনীয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফাইবার অপটিকস্ (আলোক তন্তু বিদ্যা) ব্যবহারের ফলে মানবদেহের অভ্যন্তরস্থ ফুসফুস, পাকস্থলী, বৃহদন্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র, উদর, অস্থিগ্রস্থি, শিরা, ধমনী ইত্যাদির অবস্থা যন্ত্রের সাহায্যে অবলোকন করে নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়। শুধু তাই নয়, অপটিক ফাইবার (আলোক তন্তু) সংবলিত বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্যে নমুনা সংগ্রহ করা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তুসামগ্রী ও ছোট ছোট টিউমার অপসারণ করা যায়। অতিকম্পনশীল শব্দ ও লেজারকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে। এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের অবস্থা দেখা যেমন সম্ভব হচ্ছে তেমনি মূত্রথলি ও পিত্তকোষের পাথর চূর্ণ করার কাজেও এর সফল ব্যবহার হচ্ছে। বহুমূত্র রোগীর অন্ধত্ব প্রতিরোধে ব্যবহৃত হচ্ছে লেজার রশ্মি। এই রশ্মি কোষকলা ছেদনে ও রক্তবাহী নালিকার ভেতরে জমে ওঠা প্রলেপ অপসারণেও সাহায্য করছে। কম্পিউটার প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নিয়ে এসেছে সর্বাধুনিক পর্যায়ে। এর মাধ্যমে ছবি তুলে রোগ নির্ণয় সম্ভব হচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান: শিক্ষা ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর প্রায় সবই বিজ্ঞানের উদ্ভাবন। বর্তমানে বিজ্ঞান শিক্ষা-ব্যবস্থাকে করেছে আরও আধুনিক ও উন্নত। এখন বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে রেডিও-টেলিভিশন শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটার বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করেছে এক নতুন শিক্ষা পদ্ধতি। বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা এখন কম্পিউটারেই শিখতে পারছে অসংখ্যা জিনিস। তাছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন বিখ্যাত লাইব্রেরির বই পাঠ করা যায় এবং প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন বিদেশী শিক্ষকের কাছ থেকে পড়ালেখা সম্পর্কে পরামর্শও গ্রহণ করা যায়।

আবহাওয়ায় বিজ্ঞান: মানুষের জীবনযাত্রার প্রায় সব কাজই নির্ভর করে আবহাওয়ার ওপর। আর এই আবহাওয়ায় খবরাখবর বের করতে গিয়ে বিজ্ঞান তার প্রচণ্ড ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বৈজ্ঞানিকরা মহাকাশে এমন কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরণ করেছেন যেগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে প্রতিদিনই তৈরি করছে পৃথিবীর মানচিত্র। ৭/৮ দিন আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে আসন্ন ঘূণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা এখন সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণে। তাছাড়াও কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে খনিজ সম্পদ, তেল ও গ্যাসের উৎস, মাটির উপাদান ও জলজ সম্পদ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে পঙ্গপালের আক্রমণের আশঙ্কা সম্পর্কে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কৃত্রিম আবহাওয়া তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। যেমন, মানুষ এখন কৃত্রিম বৃষ্টি নামাতে পারে, রঙ্গিন ধোঁয়া দিয়ে আকাশের গায়ে রংধনুও ‍সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া বাঁধ দিয়ে মানুষ এখন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থামিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছে। এমন দিন দূরে নয় যেদিন মানুষ আবহাওয়ার ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবে। আর তা কেবলই সম্ভব হতে পারে বিজ্ঞানের বদৌলতে।

বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ: বিজ্ঞান মানব সভ্যতার উন্নতির সর্ববৃহৎ হাতিয়ার। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানব জীবন হয়েছে সহজ ও স্বচ্ছল। কিন্তু তাই বলে বিজ্ঞান শুধুমাত্র মানুষের উপকারই করে নি। স্বয়ংক্রিয় বৈজ্ঞানিক যন্ত্র মানুষের কাজ সম্পাদন করতে শুরু করার পরপরই অসংখ্য মানুষ বেকারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের এক বিশাল জনসমষ্টির রুজি-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রসম্বলিত বড় বড় শিল্প- কারখানা ও মোটরচালিত গাড়িগুলো নষ্ট করছে পরিবেশ। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ অনেক সময় পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করছে। অ্যারোসল স্প্রে, ফ্রিজ ইত্যাদি হতে নির্গত পদার্থ পৃথিবীর ওজন স্তরকে ফুটো করে দিচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছে ও মেরুদ্বয়ের বরফ গলা শুরু হয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভয়াবহতা পৃথিবীর মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ করেছিল প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। এ সময় মানুষ বিজ্ঞানের অপব্যবহার দেখে চমকে উঠেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে অসংখ্য শহর-বন্দর ধ্বংস কর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু যত যাই হোক, বিজ্ঞানের অবদানকে মানুষ কখনই অস্বীকার করতে পারবে না। বরং বিজ্ঞানের অপব্যবহার রোধে সচেষ্ট হলে তা মানব জীবনে আরও ফলপ্রসূ প্রভাব বিস্তারের সক্ষম হবে।

উপসংহার: “বিজ্ঞান যেন এ যুগের তিলোত্তমা স্বরূপিনী যার এক হাতে আছে অমৃত ভাণ্ডার কিন্তু তার নয়ন কটাক্ষে প্রলয় ঘটে যায়।” মানুষের জীবনে তাই বিজ্ঞানের সার্থক ও ইতিবাচক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানের আলোকে মানবজীবন আলোকিত করতে হবে। বিজ্ঞানের অপব্যবহার রোধে সকল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমেই মানব জীবনের কল্যাণ সাধন করতে হবে।